রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

সংসদে নতুন ইতিহাস, একদিনে রেকর্ড ৩১টি বিল পাস

জাতীয় ডেস্ক

এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

সংসদে নতুন ইতিহাস, একদিনে রেকর্ড ৩১টি বিল পাস

সংসদে বিল পাসের রেকর্ড

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১১তম কার্যদিবসে একদিনেই সর্বোচ্চ ৩১টি বিল পাসের নজির সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিরোধী দলের সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদ, দীর্ঘ বিতর্ক এবং একপর্যায়ে ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে এসব বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। 

নজিরবিহীন এই ঘটনাকে সংসদ বিশেষজ্ঞরা দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। এদিন পাস হওয়া বিলগুলোর অধিকাংশ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারিকৃত বিভিন্ন অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া।

ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদীয় কার্যবিবরণীর শুরু থেকেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। দিনের আলোচ্যসূচিতে থাকা ৩১টি বিলের মধ্যে ২৮টি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ, যা কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই বিল আকারে উত্থাপন করা হয়। 

এ ছাড়া বাকি তিনটি বিল ছিল পূর্ববর্তী অধ্যাদেশ রহিত করে নতুনভাবে প্রণীত। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীরা একে একে বিলগুলো পাসের জন্য প্রস্তাব করেন। তবে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিলগুলো নিয়ে আলোচনার সময় সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়।অধিবেশনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ছিল ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল-২০২৬’ নিয়ে বিতর্ক। বিলটি উত্থাপনের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এর কঠোর বিরোধিতা করেন। 

তিনি বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে সেখানে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে বসানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমান সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচিতদের সরিয়ে দলীয় লোকজন দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনার পথ তৈরি করছে। এর জবাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, বিগত আমলের ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনঃপ্রবেশ ঠেকাতেই এই আইন সংশোধন জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সংশোধনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাতিল করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।

একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে এসব বিলকে গণবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবি ও বাধা উপেক্ষা করে এসব বিল পাস করা হচ্ছে বিধায় এর কোনো দায় তারা নিতে চান না। এরপরই তিনি জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী জোটের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ বা ওয়াকআউট করেন। বিরোধী দল কক্ষ ত্যাগ করার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন যে, বিল পাসের প্রতিটি ধাপে বিরোধী দলের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছেন এবং কেউ কেউ সমর্থনও দিয়েছেন। 

তাই পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে শেষ মুহূর্তে ওয়াকআউট করার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। পরে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর বিরোধী সদস্যরা পুনরায় অধিবেশনে যোগ দিলে ওয়াকআউট করার গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে ডেপুটি স্পিকারের সাথে তাদের আলোচনা হয়।

এদিন পাস হওয়া ৩১টি বিলের তালিকায় জাতীয় জীবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল। উল্লেখযোগ্য বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সংশোধন বিল। এ ছাড়া জ্বালানি খাতের সংস্কারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সংশোধন বিল এবং বাংলাদেশ গ্যাস সংশোধন বিল পাস হয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সংশোধন বিল, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল এবং বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরী কর্তৃপক্ষ বিলও এদিন কণ্ঠভোটে পাস হয়।

মানবাধিকার ও সামাজিক সুরক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রহিত ও পুনঃপ্রচলন বিল এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা বিল ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। এ ছাড়া কৃষিভূমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বিল, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল এবং মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল পাসের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা হয়। স্থানীয় সরকার কাঠামোর আমূল পরিবর্তনে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি কর্পোরেশন সংক্রান্ত সংশোধনী বিলগুলোও এদিন পাস হয়েছে। বিচার বিভাগীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল দুটিও দীর্ঘ আলোচনার পর পাস করা হয়।

শিক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার এবং বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট সংক্রান্ত সংশোধনী বিলগুলো পাস করা হয়। বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম আইন এবং মানব পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিলগুলোও এদিন আইনি বৈধতা পেয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক খাতের শৃঙ্খলায় বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশন এবং নেগুশিয়েবল ইনষ্টুমেন্ট সংশোধন বিল দুটি পাস হয়েছে। একদিনে এতগুলো বিল পাসের ফলে প্রশাসনিক কাজে গতি আসবে বলে সরকার পক্ষ দাবি করলেও বিরোধী দল মনে করছে, দ্রুত বিল পাসের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জনস্বার্থের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংসদীয় ইতিহাসে এই দিনটি দীর্ঘকাল ধরে একটি তর্কমূলক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।