অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১১:২০ পিএম
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থলভাগে মোট ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ডিএমকে লেকচার গ্যালারিতে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এই তথ্য জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গোপসাগর গবেষণা কেন্দ্র ‘বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি খাতের উদীয়মান শিল্প নিয়ে পরিকল্পনাগত দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে গ্যাসের যথেষ্ট প্রাকৃতিক উৎস মজুত রয়েছে এবং এই সম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরকার অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরেই ৩০টি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ইতিমধ্যে তিনটি কূপ খননের মাঠপর্যায়ের কাজ পুরোদমে চলছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সম্পাদিত এসব কার্যক্রমে জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে তদারকি চালানো হচ্ছে।
সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম বা সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা তুলে ধরে জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি ডেডিকেটেড সুনীল অর্থনীতি সেল দায়িত্ব পালন করছে। এই খাতে যেসব প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা পৃথকভাবে কাজ করছে, তাদের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই খাতের কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে।
এর মধ্যে জাহাজ নির্মাণশিল্পের আধুনিকায়ন, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক বন্দর অবকাঠামোর আধুনিক রূপান্তর অন্যতম।
বন্দরগুলোর সাথে দেশের প্রধান প্রধান শিল্প ও উৎপাদন অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন করাকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেন, এই যোগাযোগ স্থাপন কেবল মহাসড়ক বা সড়কপথের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রেল ও নৌপথের সমান্তরাল সম্প্রসারণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই পুরো সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা হবে।
জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে মোট দেশজ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও গবেষণাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিতে হবে। এর পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি কার্যকর ত্রিপক্ষীয় মেলবন্ধন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। আইইউবি ও এর বঙ্গোপসাগর গবেষণা কেন্দ্র সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে বলে তিনি প্রশংসা করেন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জাভেদ হোসেন। তিনি দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যবাহী কনটেইনার ওঠানো ও নামানোর কার্যক্রম চট্টগ্রাম বন্দরে সম্পাদিত হয়। সেখানে ২১ হাজার টন জ্বালানি তেলবাহী একটি জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস করতে তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অথচ সিঙ্গাপুরের মতো আধুনিক আন্তর্জাতিক বন্দরে একই পরিমাণ তেল খালাস সম্পন্ন করতে মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গোপসাগর গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল খুরশেদ আলম, যিনি বঙ্গোপসাগরের সুনীল অর্থনীতির ভৌগোলিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ উদীয়মান শিল্পগুলোর ওপর বিশদ আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মারিয়াম বিনতে হাসান ফারিন। সেমিনারের সমাপনী অংশে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লিবারেল আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক ড. বখতিয়ার আহমেদ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন