অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সুদূর ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক আশঙ্কা নয়, এর নেতিবাচক অভিঘাত বাস্তবে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
দৈনিক বণিক বার্তা এই নীতি নির্ধারণী সংলাপের আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ ও অতিরিক্ত গরমের ফলে দেশের কলকারখানায় কর্মরত সাধারণ শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।
উপকূলীয় কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা প্রবেশের কারণে আবাদযোগ্য জমির সংকট যেমন প্রকট হচ্ছে, তেমনি উপকূলবাসীর সুপেয় পানীয় জলের ওপরও তা তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
জলবায়ু সংকটের বহুমুখী অভিঘাতের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, অসময়ের অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি কিংবা প্রলয়ঙ্করী বন্যায় মাঠের কৃষি উৎপাদন বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশের প্রধান প্রধান যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে যেকোনো কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া সাময়িক বিঘ্নিত বা বন্ধ হলে সরাসরি জাতীয় রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধাক্কা আসার শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বক্তব্যে জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক সংকট ও বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেন পরিবেশমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। সাধারণ প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে, বাজারে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগে সংকোচনমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সামগ্রিক জ্বালানি খাত মারাত্মক আর্থিক ও সরবরাহ চাপে রয়েছে।
এমনকি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য আগামী পাঁচ বছরের যেসব প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা পূর্ববর্তী বহু বছরের পূর্বাভাসের তুলনায় দৃশ্যমানভাবে কম।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ অর্থনৈতিক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি কোনো চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা। সংকট কাটিয়ে টেকসই অবস্থানে ফিরতে হলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।
ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে জলবায়ু ঝুঁকি প্রশমন ও সময়োপযোগী অভিযোজন কার্যক্রমের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই যোগাযোগ অবকাঠামো সচল রাখা এবং শিল্পাঞ্চলের ধারাবাহিক উৎপাদন নিরাপদ রাখতে নীতিপ্রণেতাদের আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি।
জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষি কেবল খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, সামগ্রিক পণ্যমূল্যের স্থায়িত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
উন্নত সেচব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি এখনো বহুলাংশে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চরম জলবায়ু পরিস্থিতি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পদস্থ নীতিনির্ধারক, শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, পরিবেশবিজ্ঞানী, টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় চার শতাধিক প্রতিনিধি সংলাপে অংশ নেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন