অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
বাউল সম্রাট লালন সাঁই কেবল একজন সাধক নন, তিনি মানবতার মূর্ত প্রতীক, অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য পথপ্রদর্শক এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বলে মন্তব্য করেছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। তিনি উল্লেখ করেন, সাধক লালনের সামগ্রিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল মানুষ, মানবিক মর্যাদা এবং মানবের প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে মানিকগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, লালন সাঁই ধর্ম, বর্ণ ও কৃত্রিম জাতিগত পরিচয়ের সমস্ত দেওয়াল অতিক্রম করে মানুষের মহামিলনের বার্তা দিয়ে গেছেন। তিনি সমাজকে শিখিয়েছেন যে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র সত্য পরিচয় হলো তার মনুষ্যত্ব। বর্তমানের অস্থির পৃথিবীতে লালনের এই সার্বজনীন জীবনাদর্শ অতীতের চেয়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এমন এক শোষণহীন সমাজ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলিত হবে না এবং ধর্মের ভেদাভেদে কাউকে বৈষম্যের শিকার হতে হবে না। বিদ্বেষ নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসাই হওয়া উচিত মানুষের সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
মানবতার অভিন্ন লক্ষ্যের ওপর জোর দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, মানুষের মত ও চলার পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতার প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। বিভাজন ভুলে সম্প্রীতি ও মিলনের এই পথই লালন সাঁইয়ের মৌলিক দর্শন।
লালনসংগীতের গভীরতা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, তার গান কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়; এটি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মপরিচয় অন্বেষণ এবং মানবমুক্তির অনন্ত সুর। বাউল সম্রাটের সুরে বাংলার মাটির আবহ মিশে আছে এবং তার বাণীতে প্রকাশ পেয়েছে অস্তিত্বের গভীর দর্শন। লালনের এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের চেতনায় পৌঁছে দেওয়া সবার জাতীয় দায়িত্ব।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন খাদ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান প্রশাসন বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বকীয় পরিচয় সংরক্ষণে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সমৃদ্ধ এই লোকজ ঐতিহ্যকে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত করাই প্রধান লক্ষ্য। অবকাঠামোগত অগ্রগতির পাশাপাশি সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে এবং আত্মপরিচয়ের শেকড়কে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিএনপির রাজনীতিতেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সার্বিক কল্যাণ ও নাগরিক জীবনমান উন্নয়নের সুদৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে।
বক্তব্যে নিজ জন্মভূমি মানিকগঞ্জের প্রতি আত্মিক ভালোবাসার স্মৃতিচারণ করেন আফরোজা খানম রিতা।
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, মানিকগঞ্জের মাটি ও সাধারণ মানুষ তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার বাবা আজীবন এই জনপদের মানুষের পাশে থেকে সেবা করেছেন এবং মানুষের ভালোবাসাকে জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন। বাবার সেই জনকল্যাণমূলক আদর্শই তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা। আমৃত্যু এই মাটির ঋণ শোধ করতে মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম এবং জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) জেলা কমিটির সদস্য-সচিব শামীম বিশ্বাস।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী উম্মে সুমাইয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে `লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন` শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাসাস সিংগাইর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম।
আলোচনা পর্বের সমাপ্তিতে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও জাসাসের স্থানীয় শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী বাউল গান ও দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন। পুরো সাংস্কৃতিক পরিবেশনাটি পরিচালনা করেন শিল্পকলা একাডেমির সংগীত প্রশিক্ষক জুঁইরিরা ইসলাম নুপুর।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন