এপ্রিল ১, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হলেও জনমনে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে যে তেল ফুরিয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে, যেখানে গত কয়েকদিন ধরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে তেল সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি দাবি করেছে যে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল জমা আছে এবং সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা নেই।
সরকারি সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতির একটি বিস্তারিত চিত্র পাওয়া গেছে। বর্তমানে সরকারের গুদামে এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন ডিজেল জমা আছে।
এর পাশাপাশি সাত হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুদ রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেলের চাহিদা থাকে। সেই হিসেবে বর্তমানে যে পরিমাণ ডিজেল মজুদ আছে তা দিয়ে অন্তত আগামী ১১ দিনের চাহিদা অনায়াসেই মেটানো সম্ভব। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, এই ১১ দিন পর তেল শেষ হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়।
কারণ এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যেখানে প্রতিদিন একদিকে যেমন তেল বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে নতুন নতুন চালানের মাধ্যমে মজুদ সমৃদ্ধ করা হচ্ছে।আমদানি পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেলের একটি বড় চালান দেশে পৌঁছেছে। এছাড়া ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল গত মার্চ মাসে দেশে এসেছে। বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর জ্বালানি তেলের জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
এর বাইরে ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর থেকেও নিয়মিত পরিশোধিত তেল কেনা হয়। দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন তেলের চাহিদা থাকে যার একটি বড় অংশই ডিজেল। বিপিসি জানিয়েছে, বর্তমান মজুদ ও পাইপলাইনে থাকা নতুন চালানের মাধ্যমে এপ্রিল মাসের পুরো চাহিদা কোনো সংকট ছাড়াই পূরণ করা সম্ভব হবে।এদিকে জ্বালানি তেলের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে গত মাস থেকেই দেশে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার।
গত বছরের এপ্রিল মাসে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, এই বছরের এপ্রিলেও ঠিক একই পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ডিজেলে কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বরং সীমান্তের দিকে তেল পাচার হওয়ার একটি শঙ্কা থেকে যায়, যা রোধে বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল মজুদ করার চেষ্টা করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুদ বা স্টোরেজ সক্ষমতা থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অবকাঠামো অনুযায়ী ৩০ থেকে ৪০ দিনের বেশি তেল সংরক্ষণ করে রাখার জায়গা নেই।
একে তিনি `কৌশলগত মজুদের` সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার সঙ্গে জুন মাস পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও তাদের কাছে অপরিশোধিত তেল আসা যদি বন্ধ হয়, তবে বাংলাদেশে পরিশোধিত তেল সরবরাহে তার প্রভাব পড়তে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাম্পগুলোতে তেল দেওয়া নিয়ে গ্রাহক ও বিক্রেতাদের মধ্যে প্রায়ই বাকবিতণ্ডা ঘটছে। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন যে তারা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামত তেল পাচ্ছেন না। অন্যদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা মানতে গিয়ে তারা জনগণের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১ হাজার ৬শর বেশি `ট্যাগ অফিসার` নিয়োগ দিয়েছে।
ঢাকা মহানগরীসহ সারাদেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই কর্মকর্তারা পাম্পগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতি তদারকি করছেন এবং নিয়মিত মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন।অবৈধভাবে তেল মজুদকারীদের বিরুদ্ধেও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ৩০ মার্চ একদিনেই সারাদেশে প্রায় চারশটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা দায়েরের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানে প্রায় ৬৮ হাজার লিটার ডিজেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অকটেন ও পেট্রোল উদ্ধার করেছে প্রশাসন। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস হিসেবে আমেরিকা ও চীনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এছাড়া স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার সব ধরণের চেষ্টা চলছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি এবং আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তা যদি সফল হয় তবে দ্রুতই পাম্পগুলোর সামনের লাইন ছোট হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে। সরকার এখন মাসভিত্তিক চাহিদার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন