মে ২৩, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নিয়োগ, পদোন্নতি ও কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠেছে। স্বজনপ্রীতি, বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান নিয়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী হাসপাতালটি নিয়ন্ত্রণ করছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেটের प्रभाव কমেনি, বরং অনিয়ম আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।হাসপাতালের চেইন অব কমান্ড এখন পুরোপুরি অকার্যকর।
নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে academic যোগ্যতা ও নীতিমালা উপেক্ষার একাধিক সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। ২০১১ সালে মেডিকেল অফিসারের পদ ছেড়ে দেওয়া ডা. ইসরাত লাকিকে সম্প্রতি সরাসরি অধ্যাপক পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। ২০১৯ সালে অবসর নিয়ে সব আর্থিক সুবিধা নেওয়া ডা. মো. শাহজাহান আবার পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছেন।
অধ্যাপক নাজমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে একই সময়ে অন্য একটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল কলেজ ও এই হাসপাতাল থেকে দ্বৈত বেতন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অবসরের পর সব আর্থিক সুবিধা নিয়ে ডা. আজহার উপপরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন, যা সাধারণত কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য সংরক্ষিত। শুধু ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী ডা. কামালকে নিয়ম ভেঙে সহযোগী অধ্যাপক করা হয়েছে এবং তিনি এখন অধ্যাপক হওয়ার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগের এই ধারা গত ৫ আগস্টের পরও অব্যাহত ছিল। কোনো জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা কোনো পরীক্ষা ছাড়াই অ্যাডহক ভিত্তিতে ৬৫ জন চিকিৎসককে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে পরিচালনা বোর্ড এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনের পর প্রয়োজনীয় উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়া শুধু দুই বছরের ডিপ্লোমাধারী ২২ জন চিকিৎসককে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক হওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন হলেও এই নিয়ম মানা হচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হকের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত অফিস স্থাপন করেছেন এবং প্রায় ৪৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। হাসপাতালের জরুরি সেবায় যানবাহনের সংকট থাকলেও এই বিলাসবহুল গাড়িটি ভুয়া অনুমতিপত্রের মাধ্যমে কেনা হয়েছে বলে কর্মকর্তা-দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এই প্রশাসনিক জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মধ্যেই হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। পরিচালক পদ খালি হওয়ার পর নতুন পদের জন্য আরেকটি পক্ষ তদবির শুরু করেছে।
এদিকে পূর্ববর্তী প্রশাসনের বাতিল করা ৩৮৩ কোটি টাকার ‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ-২’ প্রকল্প নতুন করে অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে। এই প্রকল্পে শয্যা সংখ্যা সামান্য বাড়লেও যন্ত্রাংশ কেনাকাটার নামে বিশাল অর্থ অপচয়ের পাঁয়তারা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের পথ সংকুচিত হলেও এই প্রকল্প পাসের চেষ্টা চলছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক নেসার উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী চক্র সব আর্থিক খাতে নিজস্ব লোক বসিয়ে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
এছাড়া হাসপাতালের নিজস্ব জমিতে স্টাফ কোয়ার্টার থাকলেও সেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানের ১৪০টি পরিবার বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছে।সদ্য বিদায়ী পরিচালক ও বোর্ড চেয়ারম্যান অবশ্য সব অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিদায়ী পরিচালক মাহবুবুর রহমান জানান, চিকিৎসকরা অতীতে বৈষম্যের শিকার হওয়ায় তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সম্প্রসারণ প্রকল্পটি হাসপাতালের সেবার মান বাড়াবে।
চেয়ারম্যান আজিজুল হকও দাবি করেন, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে কোনো আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি। গাড়ি ব্যবহার ও অফিস কক্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন