রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

মোবাইল ফোনের জন্মকথা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

ডিসেম্বর ৮, ২০২৫, ০২:৩৭ পিএম

মোবাইল ফোনের জন্মকথা

বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া প্রায় দুষ্কর। ছোট থেকে বড় প্রায় সবার হাতেই আজ ফোন বিদ্যমান। কিন্তু আজ যে স্মার্টফোন আমাদের হাতের মুঠোয়, তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও বৈপ্লবিক যাত্রাপথ।

সেই পথের শুরু হয় ১৮৭৬ সালে যখন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে এমন এক যোগাযোগ যুগে নিয়ে আসে, যা পরের সব প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছিল।

স্থির তারযুক্ত সেই ফোন তখন দু-একজন মানুষের ঘর, অফিস আর টেবিলের সঙ্গে বাঁধা ছিল, হাতে নিয়ে ঘোরার মতো ফোনের ধারণা তখন ছিল সম্পূর্ণ কল্পনার বাইরে।

মোবাইল যোগাযোগের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রথম মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এরপর ১৯৫০-এর দশকে বেতার যোগাযোগে দ্রুত অগ্রগতি এবং ১৯৫৬ সালে সাবমেরিন যোগাযোগের জন্য প্রথম স্যাটেলাইট সিস্টেম চালু—এই সবকিছুই পরে মোবাইল ফোন তৈরির প্রযুক্তিগত ভিত্তি শক্ত করে। ১৯৬০-এর দশক ছিল মোবাইল ফোন গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ১৯৬৮ সালে মার্কিন ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন মোবাইল ফোনের নকশা তৈরির জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়।

সেই প্রকল্পই ১৯৭৩ সালের মহামুহূর্তের প্রস্তুতি তৈরি করে দেয়। সেই ১৯৭৩ সালে আমেরিকার নিউওয়ার্ক শহরে ইঞ্জিনিয়ার মার্টিন কুপার প্রথম হাতে ধরা মোবাইল ফোনটি তৈরি করেন। তিনি তখন MOTOROLA-তে কর্মরত ছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একদিন সবার হাতে একটি করে ফোন থাকবে এবং যেকোনো সময় তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। সে সময় এ ধারণা যেন বিজ্ঞান-কল্পকাহিনির গল্প ছিল। মাত্র ৩০ জনের একটি দল মাত্র ৩০ দিনের চেষ্টায় তৈরি করে বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে নিউওয়ার্কের হিলটন হোটেলে সেই মোবাইল ফোনের প্রথম উন্মোচন করা হয়।

ফোনটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১০ ইঞ্চি, চওড়া ২ ইঞ্চি, পুরুত্ব ৪ ইঞ্চি এবং ওজন ছিল এক কেজিরও বেশি। সেটির ব্যাটারি টিকত মাত্র ২০ মিনিট, তবু এটিই ছিল এক যুগান্তকারী সাফল্য। পৃথিবীর প্রথম মোবাইল কলটি করেন স্বয়ং মার্টিন কুপার তার অন্য টেলিকম জায়ান্ট AT&T-এর এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুকে। মোবাইল ফোন বাজারে আসতে আরও ১০ বছর সময় লেগে যায়। ১৯৮৩ সালে মোটোরোলা বাজারে আনে প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল ফোন—মোটোরোলা ডায়নাট্যাক (Dynatac)। এটি ছিল তুলনামূলক হালকা, ব্যাটারির স্থায়িত্ব কিছুটা বেশি এবং ব্যবহারে সুবিধাজনক। তখন ফোনটির দাম ছিল প্রায় ৪,০০০ ডলার, অর্থাৎ একেবারে অভিজাত পর্যায়ের।

কারো কাছে ‘ইট’, কারো কাছে ‘জুতা’—এ রকম অদ্ভুত আকৃতি হলেও এ ফোনই মানুষের কল্পনায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ১৯৯০-এর দশকে মোবাইল ফোন আরও ছোট হলো, হালকা হলো ও দাম কমতে শুরু করল। ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, এসএমএস, সহজ কলরেট—সবকিছু মিলিয়ে মোবাইল ফোন সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে শুরু করে এবং এ সময়ই মোবাইল ফোন বিশ্বজুড়ে যোগাযোগব্যবস্থাকে উল্টে দেয়। এরপর ২০০০-এর দশকে মোবাইল ফোন আর শুধু কথা বলার মাধ্যম থাকল না। ইন্টারনেট, ইমেইল, ক্যামেরা, মিউজিক, ভিডিও—সব একসঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করল।

ফিচার ফোন থেকে স্মার্টফোনে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরপর আসে টাচস্ক্রিন, অ্যাপ ইকোসিস্টেম, সোশ্যাল মিডিয়া, জিপিএস ও ক্লাউড—সব মিলিয়ে এক নতুন ডিজিটাল সভ্যতা গড়ে ওঠে এই স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে। আজকের এই স্মার্টফোন যেন ‘হাতের মুঠোয় বিশ্ব’। যোগাযোগ, ব্যাংকিং, ব্যবসা, পড়াশোনা, স্বাস্থ্য, বিনোদন ও নেভিগেশন—সবকিছু এক ডিভাইসে সমাধান। মার্টিন কুপারের সেই কল্পনা আজ বাস্তব—পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতেই ফোন আর তার সাহায্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তে যোগাযোগ সম্ভব।