এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম
বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন নদীগুলোতে কুমির ও বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়ার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। যেখানে ভৌগোলিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে এসব প্রাণীকে ‘প্রাকৃতিক প্রতিরোধক’ হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম পাহাড়, নদী ও উপত্যকার মধ্য দিয়ে গেছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী, প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হলেও বাকি অংশে জলাভূমি ও নদী থাকায় সেখানে স্থায়ী বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব।
গত ২৬ মার্চের একটি অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফ তাদের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের সদর দপ্তরের কর্মীদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথের ফাঁকগুলোতে সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা’ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়।
ভারতের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার কর্মী এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাপ বা কুমিরের মতো বিপজ্জনক প্রাণীকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা অমানবিক। উত্তর-পূর্ব ভারত নিয়ে গবেষণাকারী অংশুমান চৌধুরী আল জাজিরাকে জানান, এটি অনথিভুক্ত অভিবাসীদের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা। তাঁর মতে, সাপ বা কুমির বুঝতে পারবে না কে অনুপ্রবেশকারী আর কে স্থানীয় নাগরিক। এটি মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও প্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক নতুন ধরনের সহিংসতা।
বিএসএফ তাদের বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা এবং সীমান্তের কাছাকাছি ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে বেড়া স্থাপনের কাজ ধীরগতিতে চলায় বিকল্প হিসেবে এই পদ্ধতির কথা ভাবা হচ্ছে। তবে মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দর মনে করছেন, বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ ধরনের ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ বেছে নেওয়া মূলত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক বজায় রাখার একটি কৌশল। বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার অংশ হিসেবেই এমন অশুভ পরিকল্পনা করা হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই পরিকল্পনার পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞ রথিন বর্মন জানান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন নদীগুলোতে কুমির স্থানীয় প্রাণী নয়। সুন্দরবন বা আসামের সংরক্ষিত এলাকা থেকে যদি এসব প্রাণীকে সীমান্তে আনা হয়, তবে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এছাড়া নতুন পরিবেশে এসব প্রাণীর দ্রুত মারা যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্তে বেড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে শিকারি প্রাণী মোতায়েন করার কোনো আধুনিক নজির নেই। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মেয়াদে সীমান্তে সাপ বা কুমিরে ভরা পরিখা তৈরির কথা আলোচনা করেছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তিনি তা অস্বীকার করেন। ভারতের এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার মহলে তীব্র বিতর্ক চলছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন