বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ফারাক্কা চুক্তির ৩০ বছর নদী ভাঙন ও জলসংকটের খতিয়ান

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

ফারাক্কা চুক্তির ৩০ বছর নদী ভাঙন ও জলসংকটের খতিয়ান

হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ বরফ গুহা থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় চার হাজার মিটার উচ্চতায় যে জলধারার জন্ম, সেখানে তার আদি নাম ভাগীরথী। পাহাড়ি গিরিখাত পেরিয়ে আড়াইশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেবপ্রয়াগে অলকানন্দা নদীর সাথে মিলিত হয়ে সেই ধারা রূপ নেয় গঙ্গায়। হরিদ্বারের কাছে এসে প্রথম সমতল ভূমির স্পর্শ পাওয়া এই আন্তর্জাতিক নদী ভারতের উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করে পৌঁছায় বাংলাদেশ সীমান্তে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর এটি পদ্মা নাম ধারণ করে রাজশাহী, খুলনা ও ঢাকা বিভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনার সাথে মেশে। 

পরবর্তীকালে চাঁদপুরের মোহনায় মেঘনার সাথে একীভূত হয়ে বিশাল এই প্রবাহ সাগরে গিয়ে পতিত হয়। প্রায় পঞ্চাশ কোটি মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই অভিন্ন নদীর ওপর সীমান্তের মাত্র কয়েক কিলোমিটার উজানে দাঁড়িয়ে আছে ফারাক্কা বাঁধ, যা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও দুই তীরের বাস্তুতন্ত্রকে বদলে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ত্রিশ বছর মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি বছরেই। ফারাক্কা বাঁধের উজানে ভারতের মালদা জেলায় নদীর তীব্র ভাঙনে বাস্তুহারা মানুষের আর্তনাদ আজ আর কারও অজানা নয়। 

মালদার মানিকচকের বাসিন্দা ষাট বছর বয়সী আফরোজা খাতুনের চোখে এখনো ভাসে তাদের চব্বিশ বিঘার পৈতৃক ভিটেমাটি এবং বিশাল আম-লিচুর বাগান। নদীর ভাঙনে সব হারিয়ে এখন চরের অস্থায়ী ঘরে দিনাতিপাত করছেন তিনি। আফরোজা জানান, তার জন্মের সময় নদী ছিল চৌদ্দ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু চোখের সামনে সেই নদী একের পর এক গ্রাম গ্রাস করে তাদের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়। ভিটেমাটি হারানোর মানসিক শোকে তার বাবা-মা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আফরোজার নিজের ঘরই এ পর্যন্ত তিনবার ভেঙেছে। তিনি জানান, ২০০১ সালে কেবি ঝাবনা নামের বিস্তীর্ণ জনপদের দশ থেকে বারোটি গ্রাম পুরোপুরি গঙ্গার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভিটেমাটি হারানো মানুষগুলো কেউ শহরে, কেউ অন্য জেলায় চলে গেছেন, আর নিঃস্বরা আশ্রয় নিয়েছেন সুবানী টোলার মতো বালুচরে।

কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমে হুগলি নদীতে জলপ্রবাহ ঠিক রাখার লক্ষ্যে ষাটের দশকে ১৯৬১ সালে ভারত সরকার ফারাক্কা ব্যারেজ প্রকল্প গ্রহণ করে এবং ১৯৭৫ সালে তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। ব্যারেজ থেকে বের হওয়া ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেল দিয়ে গঙ্গার জল হুগলিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের পেছনে যুক্তি ছিল অতিরিক্ত জল পলি ধুয়ে নিয়ে যাবে, বন্দরের নাব্যতা ফেরাবে, কলকাতা অঞ্চলের লবণাক্ততা কমাবে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে যোগাযোগ সহজ করবে। এই ক্যানেলের জলের ওপর গড়ে উঠেছে দুই হাজার ১০০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিন্তু নদী গবেষক সুপ্রতিম কর্মকারের মতে, এই ব্যারেজের কারণে গঙ্গার প্রাকৃতিক চরিত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। 

শক্ত কংক্রিটের ব্যারেজকে ভাঙতে না পেরে নদী উজানভাগে মালদার নরম পলিমাটির স্তর ভেঙে প্রবাহিত হতে চাইছে। ফলে চরম ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফারাক্কার ভাটিতে মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার উর্বর কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে গেছে এবং গৃহহীন হয়েছেন পাঁচ লাখ মানুষ। উজানে মালদায় ২০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি জমি বিলীন হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় মালদায় ব্যাপক প্রাণহানির পর সেখানে গড়ে ওঠে ফারাক্কাবিরোধী নাগরিক আন্দোলন। স্থানীয় অধিকারকর্মী হাবিবুর রহমান জানান, ওই প্রলয়ঙ্করী বন্যার পরই সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে এই সংকট কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং ফারাক্কা ব্যারেজের কারণেই সৃষ্টি।

সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের পদ্মাপাড়ের গল্পটি আরও বেশি বঞ্চনা ও ক্ষতের। রাজশাহী সীমান্তে এসে নদীটি যখন বাংলাদেশে ঢোকে, তখন ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে একসময়কার প্রমত্ত পদ্মা পরিণত হয় ধু ধু বালুচরে। রাজশাহীর শ্রীরামপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় আশ্রয় নেওয়া ৭৪ বছর বয়সী আনফর আলী জানান, ফারাক্কা চালুর পর থেকেই নদীতে চরের আধিক্য দেখা দেয় এবং মাছের বংশ ধ্বংস হয়ে যায়। একসময় খানপুর চরে বসবাসকারী আনফর আলী নদীতে মাছ ধরে ও চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। 

জমিজমা হারিয়ে তিনি পাঁচ-ছয়বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং পেশা বদলে এখন মসজিদে খাদেমের কাজ করছেন। তিনি জানান, আগে নদী ভাঙলে পরের বছর নতুন পলিমাটি জেগে উঠত, কিন্তু এখন জমি ভাঙলে সেখানে শুধু বালুর চর পড়ে থাকে যা চল্লিশ বছরেও চাষাবাদের উপযোগী হয় না। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ খরা ও পানিসংকট দেখা দিলে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়।

ওই লংমার্চে অংশ নেওয়া নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী স্মরণ করেন, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মানুষ মহানন্দা নদীর ওপর শত শত নৌকা পাশাপাশি সাজিয়ে নৌসেতু তৈরি করে নদী পার হয়েছিলেন। তিনি জানান, ফারাক্কার কারণে নদীকেন্দ্রিক পুরো জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে বংশপরম্পরায় মাছ শিকার করে বেঁচে থাকা জেলে সম্প্রদায় ও নৌকার মাঝিরা কর্ম হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে ফারাক্কার ভয়াবহ প্রভাব। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার গড় প্রবাহ প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন প্রবাহ প্রায় ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পদ্মার অন্যতম শাখা নদী বড়াল, গড়াই, আড়িয়াল খাঁ, ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কুমার, ইছামতি, মধুমতী, পশুর এবং কপোতাক্ষে পলি জমে নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রবাহ হ্রাসের কারণে দেশের নৌ চলাচলের উপযোগী অভ্যন্তরীণ জলপথের দৈর্ঘ্য কমে মূল আয়তনের চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। উপর থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ না থাকায় বঙ্গোপসাগরের নোনা জল এখন অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডের ১৬০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এর ফলে উপকূলীয় কৃষিভূমির প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগই লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়েছে।

রাজশাহী থেকে দেড়শ কিলোমিটার ভাটিতে মধুমতী নদীর গোপালগঞ্জ পয়েন্টে কৃষক ও মৎস্যজীবী গৌরাঙ্গ পাল জানান, ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে নদীর পানি এতোটাই লবণাক্ত থাকে যে তা জমিতে দিলে ধান ও পাটের চারা পুড়ে মারা যায়। গড়াই নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশ্বখ্যাত সুন্দরী গাছসহ বহু উদ্ভিদ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

১৯৭৫ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম ৪১ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হয়, যার আওতায় এপ্রিল মাসে ১১ হাজার এবং মে মাসে ১৬ হাজার কিউসেক পানি ফিডার ক্যানেলে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়াদের পরও পানি প্রত্যাহার অব্যাহত থাকলে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ বিষয়টি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাই সরকারের আমলে পাঁচ বছর মেয়াদি দ্বিতীয় গঙ্গা চুক্তি হয়। সেই চুক্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গ্যারান্টি ক্লজ, যেখানে পানির প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশকে তার অংশের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ পানি নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে স্বল্পমেয়াদি সমঝোতা হলেও ১৯৮৮ সালের পর আর কোনো চুক্তি বহাল ছিল না। 

এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেবগৌড়ার জোট সরকারের সাথে ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের মতো কোনো সুস্পষ্ট গ্যারান্টি ক্লজ রাখা হয়নি, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রায়শই ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, ভারতে গঙ্গা অববাহিকায় তিন শতাধিক থেকে এক হাজারেরও বেশি ছোট-বড় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। উজানের উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও অন্যান্য রাজ্যে ব্যাপক কৃষিকাজ ও শিল্পায়নের ফলে ফারাক্কায় পৌঁছানোর আগেই নদীর পানি ব্যাপকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। 

বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত উল্লেখ করেন, একটি নদীকে পুরো অববাহিকা বা একক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করে উজানের অঞ্চলগুলো একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় এই মহাবিপর্যয় তৈরি হয়েছে। ইউরোপের রাইন নদীর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সুইজারল্যান্ড থেকে নেদারল্যান্ডস পর্যন্ত বিস্তৃত রাইন নদীর কমিশনে সব দেশ যৌথভাবে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করে। অথচ ভারত বরাবরই বহুপাক্ষিক আলোচনার বদলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছে।

২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিচুক্তি বা ইউএন ওয়াটার কনভেনশনে যোগ দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পানির অধিকার তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় সুষম সমাধান নিশ্চিত করতে হলে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সমন্বয়ে বহুপাক্ষিক অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি এবং রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।