সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
বাংলাদেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার পানি সংকট ও সেচ সমস্যা সমাধানে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে রাজবাড়ীর পাংশায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেগা প্রকল্প পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার উদ্যোগগুলোর একটি। বিশাল এই অবকাঠামো নির্মাণের প্রথম ধাপেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হতে হতে এর মোট ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারি কোষাগার থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া হবে এবং গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির প্রথম ধাপের অনুমোদন দিয়েছে। সব প্রস্তুতি ঠিক থাকলে আগামী ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল কাঠামোর এক প্রান্ত থাকবে রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুর ও বাহাদুরপুর এলাকায় এবং অন্য প্রান্ত থাকবে পাবনার সুজানগরে।
পদ্মা ব্যারেজ শুধু পানি আটকে রাখার কোনো সাধারণ দেয়াল নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক নদী ব্যবস্থাপনা কাঠামো। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যারেজ প্রায় দুই দশমিক নয় বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখতে সক্ষম হবে, যার মাধ্যমে প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি সরাসরি সেচের আওতায় আসবে। ব্যারেজটিতে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, মাছ চলাচলের জন্য ফিশপাস এবং নৌযান চলাচলের জন্য নেভিগেশন লক যুক্ত থাকবে। পানি ধরে রেখে সেটিকে গড়াই, চন্দনা ও হিষ্ণা নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করার জন্য অফটেক বা কৃত্রিম মুখ রাখা হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে।
সরকারি হিসাবমতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন সম্ভব হবে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর কৃষকদের নির্ভরতা কমার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও অনেক কমে আসবে। এতে কৃষি, মৎস্য ও নৌপথ মিলিয়ে প্রায় নয় লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দেশের ২৪ থেকে ২৬টি জেলার প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ এই মেগা প্রকল্পের সুফল ভোগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষির পাশাপাশি এই প্রকল্প থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
পানির প্রবাহ ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মূল ব্যারেজ এলাকায় প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া গড়াই নদীর অফটেক এলাকাতেও প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সম্প্রতি প্রস্তাবিত প্রকল্প স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসের যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করতে পারেন।
এই প্রকল্পের সঙ্গে আঞ্চলিক পানিবণ্টন ও ভূ-রাজনীতির বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ২০২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তির ভবিষ্যৎ আলোচনার বদলে সরকার নদীর মূল স্রোতকে দেশের ভেতরেই ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়াতে এই নিজস্ব উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত নদীর উজানে পলি জমা, বন্যা ও ভাঙনের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
যেহেতু গঙ্গা নদীর উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ অবস্থিত, তাই শুষ্ক মৌসুমে এই নতুন ব্যারেজ কার্যকর রাখতে ভারতের পানি ছাড়ার ওপর বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হবে। ভারত সম্পূর্ণ বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নের এই উদ্যোগকে তাদের আঞ্চলিক নীতিমালার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে পারে। তবে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার যে দেশের নিজস্ব পানিসম্পদ ও কৃষি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের এই উদ্যোগ তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন