মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
ঐতিহাসিক জাতিসংঘ ভাষণ

জাতিসংঘে খালেদা জিয়ার ভাষণে তুলে ধরেছিলেন ফারাক্কা ও নদী অধিকার

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:১৩ এএম

জাতিসংঘে খালেদা জিয়ার ভাষণে তুলে ধরেছিলেন ফারাক্কা ও নদী অধিকার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে গণতন্ত্রের বিকাশ ও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার তুলে ধরেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনের ১৩তম পূর্ণাঙ্গ সভায় তিনি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন, ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা এবং ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান। ভাষণে তিনি গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে এবং দারিদ্র্য মোকাবিলার সক্ষমতার ওপরই মূলত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার স্থায়িত্ব নির্ভর করছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে এগিয়ে নিতে উন্নত বিশ্বের সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি। পুঁজির স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার কারণে একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে সার্বিক উন্নয়ন সাধন সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, সম্পদের ঘাটতির মুখে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া এই কঠিন দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।

উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তিনি সার্বজনীন মানবাধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর সুরক্ষার প্রশ্নটিকে সংযুক্ত করেন। শীতল যুদ্ধপরবর্তী বৈশ্বিক বাস্তবতায় এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়। সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সংহতকরণের মাধ্যমে একটি উন্নত সমাজ ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য বলে তিনি ঘোষণা করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এখতিয়ার বিশ্বব্যাপী গ্রহণের পক্ষে তিনি মত দেন।

তথ্য ও প্রযুক্তির সমতা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক বাধার অবসান চেয়েছিলেন এই সরকারপ্রধান। উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যকার প্রযুক্তিগত দূরত্ব ঘোচাতে তথ্যের অবাধ চলাচলের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তির হস্তান্তরে বিধিনিষেধ থাকলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। ভাষণের একটি বড় অংশে স্থান পেয়েছিল পরিবেশ বিপর্যয় ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। পরিবেশদূষণের জন্য ধনী রাষ্ট্রগুলোকে দায়ী করে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি পাটের মতো পরিবেশবান্ধব তন্তুর সুরক্ষার কথা বলেন। কৃত্রিম তন্তুর আগ্রাসনে পাটের বৈশ্বিক বাজার নষ্ট হলে তা লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষের জীবিকায় মারাত্মক আঘাত হানবে বলে তিনি বিশ্বকে সতর্ক করেছিলেন।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে কেবল বিদেশি সাহায্য কোনো জাতিকে আত্মনির্ভরশীল করতে পারে না। তিনি বাণিজ্য বাধা দূর করা, উরুগুয়ে রাউন্ড আলোচনা দ্রুত সম্পন্ন করা এবং সমতার ভিত্তিতে উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের অগ্রগতি জানাতে গিয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, ২০০০ সালের মধ্যে জাতীয় সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে ডাল-ভাত কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারি পদক্ষেপের কথাও তিনি জানান। আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ওপর গভীর আস্থা প্রকাশ করেন তৎকালীন সার্ক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের দারিদ্র্য বিমোচন ও বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরেন।

ভাষণে সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে আসে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত পানিবণ্টন সংকট ও ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব। খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং এগুলোর পানির ওপর বাংলাদেশের স্বাভাবিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত অধিকার রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে চরম খরা দেখা দেয় এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় তৈরি হয় মারাত্মক বন্যা। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সেদিন বলেছিলেন, ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

উজানের পানিপ্রবাহ কমায় মরুকরণ, ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নৌপথের নাব্যতা হারানো এবং কৃষি ও শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি গঙ্গার পানিবণ্টনে একটি জরুরি ও স্থায়ী দ্বিপক্ষীয় চুক্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন এবং মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা আড়াই লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদ প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার সঙ্গে কাজ করার কথা জানান।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সংঘটিত জাতিগত নিধনের নিন্দা জানিয়ে তিনি নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ দাবি করেন। নামিবিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, কুয়েত, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া ও মোজাম্বিকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান স্মরণ করে তিনি জাতিসংঘের তহবিল সংকট দূরীকরণে ধনী দেশগুলোর সহায়তা কামনা করেন। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

ভাষণের সমাপ্তিতে তিনি ১৯৮০ সালে জাতিসংঘে তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রথম ভাষণের দূরদর্শী আহ্বানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। জিয়াউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বশান্তি ও মানবিক প্রগতির জন্য সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপের সেই বার্তা এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্ব সংস্থার সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখবেন তিনি। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো স্থান পাবে।

১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ভাষণ দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে এই পরিবারের দীর্ঘ চার দশকের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বাসস