শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬,

হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড পেলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড পেলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ওয়াশিংটন ডিসির ঐতিহ্যবাহী জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলরুমে আয়োজিত সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, বিশিষ্ট উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও গবেষকসহ অন্তত ৪০০ দেশি-বিদেশি অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের নাম ঘোষণার পরপরই হলরুমে উপস্থিত অতিথিরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় করতালি দিয়ে তাঁকে সম্মান জানান।

এ বছর ড. ইউনূসসহ মোট চারজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে এই বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত অন্য তিনজন হলেন ভারতের ‘সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (সেবা)-এর পরিচালক রিমা নানাবতী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও ‘টোরি বার্চ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ এবং জর্ডানের ‘মাইক্রোফান্ড ফর উইমেন’-এর বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান। মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে।

ড. ইউনূসের দীর্ঘ কাজের মূল্যায়ন করেন হিলারি ক্লিনটন।

অনুষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকার প্রশংসা করে হিলারি ক্লিনটন বলেন, তিনি নিজে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রান্তিক নারীরা কীভাবে ক্ষুদ্রঋণের সহায়তায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং নিজেদের নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা নিশ্চিত করেছেন, তা সত্যিই অভূতপূর্ব। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, ড. ইউনূস কেবল বাংলাদেশের নারীদের ভাগ্য পরিবর্তন করেননি, বরং তাঁর এই কল্যাণমুখী দর্শন আজ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

পুরস্কার গ্রহণের পর দেওয়া বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর কাজের ৫০ বছর পূর্তির কথা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, এই সম্মাননা তাঁদের বিগত অর্ধশতকের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ওয়াশিংটনের এই আয়োজন বাংলাদেশে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোকে নতুন উদ্দীপনায় উজ্জীবিত করবে।

দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর অগ্রযাত্রায় ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, দারিদ্র্যের চরম চক্রে আটকে থাকা অসহায় মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করেছে গ্রামীণ ব্যাংক। নারীদের নিজস্ব সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁরা পরিবারের আর্থিক গতিপথ বদলে দিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, একসময় লাজুক ও নীরব থাকা দরিদ্র নারীরা এখন আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের সমস্যা ও নাগরিক অধিকারের কথা তুলে ধরেন। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকৃত মালিক এবং পরিচালক এখন এই নারীরাই।

নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থী মানসিকতার বিপরীতে আত্মকর্মসংস্থানের আহ্বান জানান তিনি।

ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, ঋণগ্রহীতাদের সন্তানদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে তারা যেন নিজেদের কেবল চাকরিপ্রার্থী না ভেবে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলে। কর্মসংস্থানের খোঁজে না ঘুরে নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্যোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

সামাজিক ব্যবসার মূল দর্শন তুলে ধরে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ জানান, ব্যক্তিস্বার্থে মুনাফা অর্জন নয়, বরং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান করাই এর মূল লক্ষ্য। দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে সামাজিক ব্যবসার তহবিল থেকে একাধিক সাধারণ হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় উদ্বৃত্ত অর্থ পুনরায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা খাতেই বিনিয়োগ করা হয়।

বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত চাকরিপ্রার্থী তৈরি করার এক ভুল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মধ্যকার সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতাকে জাগিয়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ হওয়া উচিত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা।

উদ্যোক্তা তৈরির এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেন ড. ইউনূস।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয় মূলত ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। সনদ অর্জনের অন্ধ দৌড় থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে এনে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও মূলধন সংস্থানের সার্বিক সহায়তা দেবে এই প্রতিষ্ঠান। নতুন এই উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁদের স্বপ্নযাত্রার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।