বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,

বিদায়ের আগে বিশেষ সম্মান পেলেন মেসি

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:২৭ এএম

বিদায়ের আগে বিশেষ সম্মান পেলেন মেসি

ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচে মাঠে নামার ঠিক আগমুহূর্তে এক অনন্য ও বিরল সম্মাননায় ভূষিত হলেন মহাতারকা লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিট আগে আর্জেন্টিনার শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেট তাকে আনুষ্ঠানিক সম্মানসূচক সদস্যপদ প্রদান করেছে। ক্লাবটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট স্তেফানো দি কার্লো নিজে উপস্থিত থেকে মেসির হাতে বিশেষ সদস্যপদ কার্ড, একটি স্মারক ফলক এবং তার নাম খচিত ক্লাবের ঐতিহাসিক বিশেষ জার্সি তুলে দেন।

জাতীয় দলের হয়ে সম্ভাব্য শেষ উপস্থিতির দিনটি মেসির জন্য সকাল থেকেই ছিল আবেগমথিত ও স্মরণীয়। বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণের পর তিনি সরাসরি চলে যান বুয়েনস আয়ার্সের বিখ্যাত মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে। সেখানে ক্লাব প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে রিভার প্লেট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বরণ করে নেওয়া হয় এবং সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়।

মেসিকে সম্মানসূচক সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে নিজেদের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে রিভার প্লেট। ক্লাবের পক্ষ থেকে দেওয়া বার্তায় বলা হয়, এই ঐতিহাসিক দিনে প্রেসিডেন্ট স্তেফানো দি কার্লোর উপস্থিতিতে সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে ক্লাবের বিশেষ সম্মানসূচক সদস্যপদ কার্ড উপহার দেওয়া হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি স্মৃতিফলক এবং তার নাম লেখা পবিত্র জার্সি।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে ক্লাবটি আরও লেখে, ফুটবলের জন্য ধন্যবাদ, লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে দেশের শ্রেষ্ঠতম ক্রীড়াব্যক্তিত্বকে মাঠের শেষ যাত্রায় কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই আয়োজন করে রিভার প্লেট। এটি শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক সদস্যপদ নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে তার অনন্য অবদানের এক গভীর মূল্যায়ন। মেসির জন্য প্রস্তুতকৃত এই সম্মানসূচক সদস্যপদ কার্ডটির নকশাতেও রাখা হয়েছে অনন্য চমক। সাধারণ সদস্যপদ কার্ডের প্রচলিত ধারার বদলে এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ কোড ARG18122022।

এই বিশেষ সাংকেতিক নম্বরের মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক দিনটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ওই দিন কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি জিতেছিল এবং বিশ্বজয়ী অধিনায়ক হওয়ার আজন্ম স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন মেসি। রিভার প্লেট তাদের দেওয়া কার্ডটিতে মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলজীবনের এই শ্রেষ্ঠতম অর্জনকেই চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছে।

মেসির হাতে সমর্পণ করা স্মারক ফলকটিতেও ছিল তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে এক বিশেষ শ্রদ্ধাবার্তা। সেখানে তাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক হিসেবে সম্মান জানানোর পাশাপাশি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় যে, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে তিনি আজীবন অপরাজিত। রিভার প্লেট কর্তৃপক্ষ তাকে ফুটবলের সর্বকালের কিংবদন্তি এবং জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেয়।

মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের সঙ্গে মেসির খেলোয়াড়ি জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ ক্লাব রাজনীতিতে বিভিন্ন ক্লাবের প্রতি তার সম্মান থাকলেও এই স্টেডিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার সাফল্যের বড় এক অংশ। এখানে জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের বহু গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের রোমাঞ্চকর লড়াই থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রীতি ম্যাচ—সবখানেই এই মাঠে মেসির আধিপত্য ছিল স্পষ্ট।

এই ঐতিহাসিক মনুমেন্টালের ঘাসেই জাতীয় দলের হয়ে চারটি বড় শিরোপা উদযাপনের স্মৃতি রয়েছে তার। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির সর্বাধিক গোল করা শীর্ষ চারটি স্টেডিয়ামের তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছে এই মাঠ। বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আগের ২৮টি ম্যাচ খেলেও মেসি কোনো হারের স্বাদ পাননি। তাই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার মঞ্চ হিসেবে এই চেনা মাঠকে বেছে নেওয়া তার সঙ্গে মাঠটির বিশেষ সংযোগকে নতুন অর্থ দেয়।

মেসির সঙ্গে রিভার প্লেটের যোগসূত্র অবশ্য কেবল মনুমেন্টালের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০০০ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় পাড়ি জমানোর কিছুদিন আগে, যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর, তখনই রিভার প্লেটের মূল একাডেমি দলে যোগ দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ২০১৯ সালে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের সেই অপ্রকাশিত গল্প নিজেই বর্ণনা করেছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

মেসি জানিয়েছিলেন, রিভার প্লেটের ট্রায়ালে যাওয়া এক কিশোরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনিও ক্লাবটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে গিয়ে সমবয়সী কিশোরদের সঙ্গে অনুশীলন ম্যাচে নামেন মেসি এবং কয়েকটি দুর্দান্ত গোল করে তাক লাগিয়ে দেন। তার সহজাত ফুটবলশৈলী দেখে ক্লাবের কোচ ও কর্মকর্তারা তাকে রেখে দেওয়ার তাৎক্ষণিক প্রস্তাব দেন।

মেসির ভাষ্য অনুযায়ী, রিভার প্লেট কর্তৃপক্ষ তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ছাড়পত্র নিয়ে আসতে বলেছিল এবং বাকি যাবতীয় প্রক্রিয়া ক্লাবই পরিচালনা করবে বলে আশ্বস্ত করেছিল। শুধু তা-ই নয়, তৎকালীন সময়ে তার ব্যয়বহুল গ্রোথ হরমোনের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল।

তবে ভাগ্যের নাটকীয়তায় শেষ পর্যন্ত মেসির ঠিকানা হয় ইউরোপের বার্সেলোনায়। শৈশবের সেই অধ্যায়ে রিভার প্লেটে তার চূড়ান্ত যাত্রা সম্পন্ন না হলেও ক্লাবের সঙ্গে সেই স্মৃতি আজীবন তার মনে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ থেকে বিদায়ের ক্ষণে রিভার প্লেটের এমন উষ্ণ সম্মাননা মেসির বিদায়ী দিনটিকে এক অবিস্মরণীয় মহিমায় ভরিয়ে তুলেছে। একাধারে জাতীয় পতাকাবাহী জার্সিতে শেষবার বুট পরার তীব্র আবেগ, অন্যদিকে শৈশবের স্মৃতিজড়িত মনুমেন্টালের ঘরের ক্লাব থেকে এমন পরম প্রাপ্তি—সব মিলিয়ে দিনটি পরিণত হয় ফুটবলের এক রাজকীয় বিদায়লগ্নে।