অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের বাজারে এক আমূল রূপান্তর শুরু হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে কাজের দুনিয়ায় একদিকে যেমন বহু প্রথাগত পেশা পুরোপুরি বিলুপ্তির মুখে পড়বে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ও উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পেশা। যে কাজগুলো মূলত পুনরাবৃত্তিমূলক এবং নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয়, সেগুলো এখন দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক সফটওয়্যার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে।
ম্যানুয়াল উপায়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সনাতন ডেটা এন্ট্রির কাজের সুযোগ পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে আসছে। কাগজ-কলমে হিসাব রাখা বা স্প্রেডশিটে তথ্য ইনপুট দেওয়ার সাধারণ কাজগুলো বর্তমানে বিভিন্ন অটোমেটেড সফটওয়্যার ও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা দখল করে নিচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের কাস্টমার কেয়ার ও কল সেন্টার প্রতিনিধিদের বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে জায়গা করে নিচ্ছে সংবেদনশীল ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং কনভার্সেশনাল চ্যাটবট। একই সাথে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, অনলাইন ব্যাংকিং ও এটিএমের সুবিধার ফলে ব্যাংকের কাউন্টারে সরাসরি নগদ অর্থ লেনদেনের শারীরিক কর্মীর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে।
ভাষা ও কনটেন্ট তৈরির জগতেও ব্যাপক পরিবর্তনের ধাক্কা লাগছে। উন্নত ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো এখন অত্যন্ত কম সময়ে বিভিন্ন ভাষার নিখুঁত রূপান্তর ও ব্যাকরণ সংশোধনের কাজ করতে পারায় শিক্ষানবিস অনুবাদকদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। একইভাবে এআই ইমেজ জেনারেটর এবং টেক্সট মডেলের প্রসারের কারণে প্রাথমিক স্তরের কনটেন্ট রাইটিং ও সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইনের কাজগুলো সহজে তৈরি হওয়ায় জুনিয়র কর্মী ও ফ্রিল্যান্সারদের কাজের পরিধি ছোট হয়ে আসছে। এমনকি চালকবিহীন বাণিজ্যিক স্বচালিত যান পুরোদমে রাস্তায় নামলে দূরপাল্লার ট্রাক চালনা ও পণ্য সরবরাহকারী ড্রাইভারদের চাহিদাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিপরীতভাবে মানবিক মেধা, জটিল সমস্যা সমাধান ও প্রযুক্তি পরিচালনার সাথে যুক্ত ক্ষেত্রগুলোতে কর্মসংস্থানের চাহিদা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং এগুলোকে কলকারখানা ও সেবা খাতে বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ প্রকৌশলীদের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে। করপোরেট ও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ বা বিগ ডেটা অ্যানালিসিসের দক্ষতা আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে দামি যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজনীয়তা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, কারণ বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত নির্ভরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ডেটা চুরি ও ডিজিটাল অনুপ্রবেশের ঝুঁকি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ক্লিন টেকনোলজি ও নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ব্যাটারি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের কদর বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রযুক্তি উন্নত হলেও চিকিৎসক, নার্স, থেরাপিস্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শকদের চাহিদা কখনোই কমবে না, কারণ বিশ্বজুড়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এছাড়া কৃষি, চিকিৎসা ও শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ড্রোন ও আধুনিক রোবট নকশা করা এবং সেগুলোর কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক প্রযুক্তিবিদ প্রয়োজন হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সঠিকভাবে কার্যকর নির্দেশনা দেওয়া অর্থাৎ প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এর নৈতিক ও আইনি ব্যবহার তদারকির নতুন ক্ষেত্রগুলোও প্রসারিত হচ্ছে।
যন্ত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় মানুষের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও জটিল পরিস্থিতি বিশ্লেষণের দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে।
ভবিষ্যতের পরিবর্তিত কর্মজগতে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে কেবল সনাতন সনদপত্রের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের দিকে নজর দিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় উপাত্ত হাজির করতে সক্ষম হলেও কোনো সংকটময় মুহূর্তে সঠিক মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল মানুষের হাতেই থাকবে। নতুন ডিজিটাল টুল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কৌশল দ্রুত আয়ত্ত করাই হবে টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম বলে দিনাজপুর টিভি ডট কম-এর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন