মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

৫০ বছর পর চাঁদে মানুষ চার নভোচারীর রোমাঞ্চকর যাত্রা

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

মার্চ ৩১, ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

৫০ বছর পর চাঁদে মানুষ চার নভোচারীর রোমাঞ্চকর যাত্রা

আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী

চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্ন পড়ার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। দীর্ঘ এই বিরতির পর আবারও পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহটিকে ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখছে মানবজাতি। আর্টেমিস ২ মিশনের মাধ্যমে চারজন নভোচারী খুব শীঘ্রই চাঁদের কক্ষপথে আবর্তিত হতে যাচ্ছেন যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মহাকাশ জয়ের নতুন পথ উন্মোচন করবে। অ্যাপোলো মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদের এত কাছাকাছি পৌঁছাবে। 

এই মিশনে অংশ নিচ্ছেন নাসার তিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার এবং ক্রিস্টিনা কোচ। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তারা প্রত্যেকেই কেবল দক্ষ পাইলট, প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী নন, বরং ব্যক্তিগত জীবনে তারা কারো স্বামী, স্ত্রী কিংবা বাবা-মা। 

এক বিশাল ঝুঁকি ও রোমাঞ্চের ভারসাম্য রক্ষা করেই তারা এই ঐতিহাসিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।এই মিশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মার্কিন নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ টেস্ট পাইলট রিড ওয়াইজম্যান। 

এর আগে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছয় মাস কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। মজার ব্যাপার হলো, আকাশে উড়তে ভালোবাসলেও মাটিতে দাঁড়িয়ে উচ্চতা দেখে কিছুটা ভয় পান এই কমান্ডার। ব্যক্তিগত জীবনে রিড এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০২০ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একা হাতে তার দুই কিশোরী মেয়েকে বড় করছেন। রিড মনে করেন তার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও ফলপ্রসূ সময় হলো একা বাবা হিসেবে সন্তানদের দায়িত্ব পালন করা। 

এই মিশনে যাওয়ার আগে তিনি তার সন্তানদের বাস্তব ঝুঁকির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। সন্তানদের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে তিনি তার উইল এবং ট্রাস্ট ডকুমেন্টের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছেন যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তারা বিপদে না পড়ে। আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য রিড তার ব্যক্তিগত সামগ্রী হিসেবে একটি ছোট নোটপ্যাড সাথে নিচ্ছেন যেখানে তিনি মহাকাশে থাকা অবস্থায় তার চিন্তাভাবনাগুলো লিখে রাখবেন।

মিশনের বিশেষজ্ঞ হিসেবে রয়েছেন ক্রিস্টিনা কোচ যিনি একজন দক্ষ প্রকৌশলী ও পদার্থবিদ। ২০১৩ সালে নভোচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মহাকাশে দীর্ঘতম সময় কাটানো নারীর রেকর্ড গড়েন। ২০১৯ সালে ৩২৮ দিন মহাকাশ স্টেশনে কাটিয়েছিলেন তিনি এবং প্রথম সম্পূর্ণ নারী মহাকাশচারী দলের হয়ে স্পেসওয়াক করেছিলেন। মিশিগানে জন্ম নেওয়া ক্রিস্টিনা হতে যাচ্ছেন চাঁদে ভ্রমণকারী প্রথম নারী। তার মহাকাশযাত্রার অনুপ্রেরণা ছিল ছোটবেলার একটি ছবি। 

অ্যাপোলো ৮ মিশন থেকে বিল অ্যান্ডারসের তোলা বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ বা পৃথিবীর উদয়ের একটি পোস্টার তার ঘরে ছিল। যখন তিনি জানলেন কোনো অটোমেটিক ক্যামেরা নয় বরং একজন মানুষের হাতের স্পর্শে সেই ছবিটি তোলা হয়েছিল, তখনই তিনি নভোচারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্রিস্টিনা তার সাথে প্রিয়জনদের হাতে লেখা কিছু চিরকুট নিয়ে যাচ্ছেন যা তাকে পৃথিবীর মাটির সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত রাখবে।

আর্টেমিস ২ মিশনের আরেক বিশেষজ্ঞ জেরেমি হ্যানসেন। তিনি রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক ফাইটার পাইলট। মহাকাশে এটিই হবে তার প্রথম যাত্রা তবে তিনি নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে নতুন নভোচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি প্রথম কোনো অ-মার্কিন নাগরিক হিসেবে চাঁদের পথে যাত্রা করছেন যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ রাজনীতির ক্ষেত্রে এক বড় মাইলফলক। জেরেমি তার শৈশবের কথা মনে করে বলেন গ্রামীণ কানাডায় বড় হওয়ার সময় তার গাছের ঘরটিকে তিনি মহাকাশযান বানিয়ে খেলতেন। 

এই মিশনে তিনি তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের জন্য চারটি চাঁদ আকৃতির লকেট সাথে নিচ্ছেন যেগুলোতে তাদের জন্মদিনের পাথর বসানো রয়েছে। এছাড়া কানাডার ঐতিহ্য হিসেবে তিনি কিছু ম্যাপল সিরাপ ও ম্যাপল কুকিজ তার সাথে চন্দ্রভ্রমণে নিয়ে যাচ্ছেন।মিশনের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভিক্টর জে গ্লোভার। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ফাইটার পাইলট এবং নাসার স্পেসএক্স ক্রু ১ মিশনের পাইলট হিসেবে আগে মহাকাশ স্টেশনে সময় কাটিয়েছেন। 

তিনি হতে যাচ্ছেন চাঁদে ভ্রমণকারী প্রথম কৃষ্ণবর্ণের মানুষ। ভিক্টরকে এই দলের সবচেয়ে ক্যারিশম্যাটিক সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার কল সাইন ‘আইকেই’ মূলত তার গভীর জ্ঞান ও তিনটি মাস্টার্স ডিগ্রির ইঙ্গিত দেয়। ভিক্টর এই অভিযানের প্রস্তুতির জন্য ১৯৬০-এর দশকের জেমিনি এবং অ্যাপোলো মিশনের পুরনো গবেষণাপত্রগুলো পড়ছেন যাতে সেই সময়ের পাইলটদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। তিনি তার ব্যক্তিগত সামগ্রী হিসেবে একটি বাইবেল, নিজের বিয়ের আংটি এবং পরিবারের কিছু ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কার সাথে নিচ্ছেন। 

এর পাশাপাশি অ্যাপোলো ৯-এর নভোচারী রাসটি সোয়াইকার্টের সংকলিত কিছু অনুপ্রেরণামূলক উক্তিও তার সঙ্গে থাকবে।এই চার নভোচারীর প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন যে অন্বেষণ করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মহাকাশের এই বিশালত্বের মাঝে নিজেদের অবস্থান এবং অস্তিত্বের বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই যাত্রা। নাসা প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই চার নভোচারী তাদের লক্ষ্যকে একটি মাত্র বাক্যে প্রকাশ করেছেন। 

ক্রিস্টিনা কোচ বলেছেন তারা প্রস্তুত, হ্যানসেন যোগ করেছেন তারা যাচ্ছেন, আর ভিক্টর গ্লোভার গন্তব্য হিসেবে চাঁদের নাম নিয়েছেন। সবশেষে কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান পুরো বিষয়টি পূর্ণ করেন এই বলে যে এই যাত্রা সমগ্র মানবজাতির জন্য। আর্টেমিস ২ কেবল একটি বৈজ্ঞানিক মিশন নয় বরং এটি মানুষের সাহস ও স্বপ্নের এক নতুন জয়গান যা পৃথিবীর কোটি মানুষের চোখকে আবারও চাঁদের রুপালি আলোর দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।