অক্টোবর ২, ২০২৬, ১১:১৪ পিএম
শিক্ষার্থীদের তীব্র ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে ফ্রান্সে দুই বছর মেয়াদি বিটিএস ও প্রেপা কোর্সের বার্ষিক নিবন্ধন ফি সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে উচ্চমাধ্যমিক বা বিএসি পাসের পর স্নাতকপূর্ব এই দুটি বিশেষায়িত কোর্সে অধ্যয়নের জন্য শিক্ষার্থীদের আর কোনো বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে হবে না। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। পূর্বে এসব কারিগরি ও প্রস্তুতিমূলক কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বছরে প্রায় ২৭০ ইউরো হারে বাধ্যতামূলক ফি দিতে হতো।
সরকার শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান দাবি মেনে নিয়ে ফি বাতিলের এই ছাড় দিলেও দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও রাজপথের বিক্ষোভ বিন্দুমাত্র প্রশমিত হয়নি। বরং বৃহস্পতিবার থেকেই সমগ্র ফ্রান্সের এক হাজারেরও বেশি হাই স্কুলে ধর্মঘট ও অবরোধ কর্মসূচি বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই একক দিনেই ১ হাজার ২০টিরও বেশি হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক ধর্মঘটে অংশ নেন। এর মধ্যে ২২২টি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চবিদ্যালয় পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই আন্দোলনের তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে গত ২৮ সেপ্টেম্বর পুরোপুরি অবরুদ্ধ স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৮০টি। বর্তমান সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী, ইউরোপীয় এই দেশটির প্রায় প্রতি চারটি হাই স্কুলের একটিতে কোনো না কোনো উপায়ে অসন্তোষ ও ধর্মঘটের প্রভাব দৃশ্যমান রয়েছে। রাজধানী প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্ব শহরতলি ক্রেতেইয়ের সাঁ-দেকজুপেরি হাই স্কুলে আনুমানিক ১০ দিন পূর্বে সূচনা হওয়া এই অসন্তোষ দ্রুত দাবানলের মতো সমগ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তারের সাথে সাথে পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে এবং বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘাত বাঁধে। কয়েকটি প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় এবং রাজপথে ডাস্টবিনে আগুন দেওয়ার ফলে পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও জাতীয় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও নথিবদ্ধ করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠক শেষে ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয় যে চলমান আন্দোলনটি এখন সুনির্দিষ্ট শিক্ষাদাবি অতিক্রম করে ধ্বংসাত্মক নগরভিত্তিক সহিংসতার দিকে মোড় নিয়েছে।
সহিংস কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে বৃহস্পতিবার এক দিনেই দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নিশ্চিত করেছেন যে আন্দোলন চলাকালীন সংঘর্ষে এ পর্যন্ত মোট ৬৫ জন শিক্ষক ও স্কুল কর্মকর্তা এবং অন্তত ১৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে শিক্ষার্থীদের মূল আন্দোলনটি এখন উগ্র চরমপন্থী ও নাশকতাকারী গোষ্ঠীগুলোর কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের শীর্ষ প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন আন্দোলনের কিছু মৌলিক দাবির প্রতি নীতিগত সমর্থন ব্যক্ত করেছে। সংগঠনটির প্রধান ব্রুনো ববকিয়েভিচ উল্লেখ করেন, শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত শিক্ষাসংক্রান্ত কিছু দাবির সঙ্গে শিক্ষক প্রশাসন পুরোপুরি একমত। তবে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সামগ্রিক বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী সহিংস অংশ কেবল নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছে, যা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সার্বিক পরিস্থিতি দ্রুত সাধারণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও তিনি গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন