অক্টোবর ২, ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও সমন্বিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা সেপা চুক্তি স্বাক্ষর, বাংলাদেশে বৃহত্তর কোরীয় বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ এবং কৌশলগত সামরিক প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। শুক্রবার (২ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিউলে অনুষ্ঠিত পৃথক এই মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করা হয়। সিউলে কোরিয়ার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে এই ফলপ্রসূ কূটনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পার্ক ইউন-জু এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী লি ডু-হির সঙ্গে পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। পার্ক ইউন-জুর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং-এর উদ্দেশে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। তিনি দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ দিতে কোরীয় সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বাত্মক প্রস্তুতির কথা জানান।
বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন তিনি। চুক্তিটি দ্রুততম সময়ে সই হওয়ার জোরালো আশা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, কোরীয় বাজারে বাংলাদেশি রফতানি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও বৃহত্তর প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের দাবি জানান। একই সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর চিপ, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, আধুনিক জাহাজ নির্মাণ শিল্প, হালকা প্রকৌশল, উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর খাতে কোরীয় উদ্যোক্তাদের সরাসরি বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। তিনি কৃষি উৎপাদন, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, বন্দর ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস খাত, ডিজিটাল রূপান্তর, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক সেবামূলক খাতে বিদ্যমান বাণিজ্য সম্ভাবনার বিবরণ তুলে ধরেন।
এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম বা ইপিএস কর্মসূচির আওতায় কোরিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে সিউলের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন হুমায়ুন কবির।
কোরিয়ার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারিত্বের প্রশংসা করে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন, মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ সমৃদ্ধকরণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি রূপান্তরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ দেন। বিশ্বমঞ্চে কোরিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের রূপান্তরের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তিনি উল্লেখ করেন যে কোরিয়ার অভূতপূর্ব জাতীয় উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। প্রতিমন্ত্রী নিয়মিত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক বা এফওসি এবং অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের নিয়মিত কূটনৈতিক বিনিময়ে সন্তোষ প্রকাশ করে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য অব্যাহত মানবিক সহায়তা প্রদানে কোরিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সিউলের সক্রিয় সমর্থন ও ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
একই বৈঠকে উভয় পক্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা মতবিনিময় করে এবং জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে। পরবর্তীতে দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী লি ডু-হির সাথে অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে পেশাগত সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কার্যক্রম এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্ক জোরদার করার ওপর সুনির্দিষ্ট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্স বাহিনীর সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদানে কোরিয়ার সক্রিয় সহায়তার প্রশংসা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশি অফিসারদের জন্য বিশেষায়িত সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের আসন ও সুযোগ আরও বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানান। একই সাথে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পরিচালিত বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা কোর্সগুলোতে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে কোরীয় সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রেরণের আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী কোরীয় প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন যে বাংলাদেশ বর্তমানে নিজস্ব একটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। এই নবীন খাতে উচ্চপ্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে কোরিয়ার সরাসরি বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান তিনি। বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও নিবিড় করার ইতিবাচক আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে কোরীয় পক্ষ সামরিক প্রশিক্ষণ বিনিময়, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ উভয় দেশের পারস্পরিক সম্মত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতা সম্প্রসারণে নিজেদের পূর্ণ প্রস্তুতির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।
তথ্যসূত্র: বাসস

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন