অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
‘দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে’—যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ভাষণে গলা ভেঙে যাওয়া নেহা বোরার কথা বলার অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল।
তিনি নকশালপন্থী দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সভাপতি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেওয়ার ঠিক একদিন আগেই দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নারেলা অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে তাকে সন্ধ্যায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
তার আগের দুই দিন টানা দিল্লির মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেছেন তিনি। তাই স্টেজে উঠেই তিনি বলেছিলেন, আমার গলা ও শরীরের অবস্থা যেমন ভাঙা, তেমনই অবস্থা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও এসআরএফটিআইয়ের।
এই যাত্রার শুরু চলতি বছরের জুলাই মাসে। ভারতের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত অভিজিৎ দীপকে ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি যে মুখটি দেশজুড়ে নজর কেড়েছিল, তিনি ছিলেন নেহা বোরা। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির প্রতিবাদের সমর্থনে তিনি তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে অনশন করেছিলেন।
সিজেপি আন্দোলনের পর তিনি ফের আলোচনায় আসেন যখন ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে রাঁচিতে যান। সেখানে তার মুখে কালি ছুড়ে মারা হলেও তিনি অবিচল ছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, মুখে কালি ছুড়ে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না। দিল্লির আন্দোলনে তিনি প্যালেট গান ও লাঠিচার্জের মুখোমুখি হয়েছেন।
ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় নেহা এখন দেশের চলমান যুব আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তার দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্টভাষী বক্তৃতা এবং লড়াকু মনোভাবের কারণে তিনি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তৃ্তা ভাইরাল হয়েছে।
সম্প্রতি তিনি এবং তার সমর্থকেরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নেমেছেন। এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের জন্য জ্ঞানেশ কুমার দায়ী এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন বলে বিরোধী দলের অভিযোগ।
নেহার আদি নিবাস উত্তরাখণ্ডে। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউ-তে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি সক্রিয় রয়েছেন। নেহা বোরা এমন একটি পরিবারে জন্ম নিয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি-সমর্থক।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার পরিবারে বিজেপির কট্টর সমর্থক রয়েছেন এবং রাজনীতি নিয়ে বাড়িতে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই পরিবারে এই উত্তেজনা চলে আসছে। তবে আর্থিক ও জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট স্বাধীন ছিলেন বলে জানান তিনি।
সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্ব ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন নেহা। তার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলন থেকে শিখেছে যে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি চান, যন্তর-মন্তরের আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া শক্তি এসআইআর, নির্বাচনক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ, শ্রমিকদের অধিকার এবং নারীদের সংরক্ষণের মতো অন্যান্য আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ুক। তার কাছে এই আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন