অক্টোবর ২৪, ২০২৫, ১১:২৮ এএম
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, রক্ষণশীল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান নেতা সৌদি আরব চলতি ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ইসরাইলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’-কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন গাজায় যুদ্ধবিরতি চলছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। যদি ট্রাম্পের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়, তবে তা হবে আব্রাহাম চুক্তির পর এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা, যা দশকের পর দশক ধরে চলে আসা আরব-ইসরাইল সম্পর্কের সমীকরণকে আমূল বদলে দেবে।টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, তিনি মনে করেন সৌদি আরব এবং ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এই বছরের শেষ নাগাদই রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে।
আব্রাহ চুক্তি হলো ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল এবং কয়েকটি আরব মুসলিম দেশের (সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান ও মরক্কো) মধ্যে স্বাক্ষরিত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি। সৌদি আরব এই চুক্তিতে যোগ দিলে তা হবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি আমরা এর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আমার মনে হয় সৌদি আরবই এই ক্ষেত্রে পথ দেখাবে (অন্যান্য আরব দেশগুলোকে)।’
কেন তিনি এতটা নিশ্চিত, তার একটি ব্যাখ্যাও দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। তার মতে, অতীতে সৌদি আরব এবং ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে প্রধান দুটি বাধা ছিল গাজা পরিস্থিতি এবং ইরানের হুমকি। ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ‘তাদের (সৌদি আরবের) গাজা এবং ইরান নিয়ে সমস্যা ছিল। এখন তাদের এই দুটি সমস্যা আর নেই।’ যদিও গাজা উপত্যকায় সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, কিন্তু সেখানকার মানবিক পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধান বহু দূরে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব এখনো বিদ্যমান। তাই ট্রাম্পের এই ‘সমস্যা নেই’ মন্তব্যটি বাস্তবতার নিরিখে কতটা সঠিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে ট্রাম্প তার অবস্থানে অনড়। চলতি বছরের মধ্যেই সৌদি আরব এই চুক্তিতে যোগ দেবে কিনা, এই সরাসরি প্রশ্নের জবাবে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘হ্যাঁ, তারা তা করবে।’
সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি দেশ এবং মক্কা ও মদিনার পবিত্র মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ায় ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তটি হবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সুদূরপ্রকারী। ঐতিহাসিকভাবে, সৌদি আরব ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার (দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান) শর্তে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছিল (আরব পিস ইনিশিয়েটিভ)।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে রিয়াদ কিছুটা নমনীয় হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছিল। গাজা যুদ্ধের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা বেশ খানিকটা এগিয়েছিল বলেও খবর বেরিয়েছিল। তবে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের পর সেই আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। ট্রাম্প এখন দাবি করছেন, সেই বাধাগুলো দূর হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও জানান যে, তিনি কোনো এক সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা পরিদর্শন করার পরিকল্পনা করছেন। তবে তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রকৃত নেতা হিসেবে মনে করেন না বলেও মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের (ফিলিস্তিনিদের) এখন কোনো নেতা নেই, অন্তত একজন দৃশ্যমান নেতা নেই। তারা আসলে তা চায়ও না, কারণ তাদের নেতাদের প্রত্যেককেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি যোগ করেন যে, তিনি একসময় মাহমুদ আব্বাসকে ‘যুক্তিসঙ্গত’ বলে মনে করলেও, এখন আর তা মনে করেন না। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব নিয়ে তার দীর্ঘদিনের অসন্তোষকেই প্রকাশ করে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আব্রাহাম চুক্তিকে তার প্রথম মেয়াদের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন এবং সৌদি আরবকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সেই সাফল্যকে পূর্ণতা দিতে আগ্রহী। তার এই ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন যুগের সূচনা করবে, যেখানে ইসরাইল আরব বিশ্বের সঙ্গে আরও বেশি একীভূত হবে।
তবে এর ফলে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। রিয়াদ বা জেরুজালেম থেকে এখনো ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাই এই বছরের শেষ নাগাদ সত্যিই সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় কিনা, তা দেখার জন্য বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন