শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২৬,

জন্মদিনে এআই নিয়ে তরুণদের বার্তা দিলেন জেমস

বিনোদন ডেস্ক

অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

জন্মদিনে এআই নিয়ে তরুণদের বার্তা দিলেন জেমস

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী মাহফুজ আনাম জেমস নিজের জন্মদিনে বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যৎ সংগীতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তরুণ মিউজিশিয়ানদের উদ্দেশে জরুরি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। শুক্রবার (২ অক্টোবর) ৬২ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দেশের বর্তমান সংগীতাঙ্গনের সার্বিক পরিস্থিতি ও নিজের দীর্ঘ কর্মজীবন নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন এই সংগীত তারকা। নিজের জন্মদিন কখনো ঘটা করে উদযাপন না করলেও ভক্তদের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত হন।

সমসাময়িক সংগীতাঙ্গনের রূপান্তরকে ফটোগ্রাফির বিবর্তনের সাথে তুলনা করে জেমস জানান, অ্যানালগ ফিল্মের যুগে আলোকচিত্রের যে বিশেষ গুরুত্ব ছিল, স্মার্টফোনের প্রসারে তা আজ সবার মুঠোয় চলে এসেছে। একইভাবে ক্যাসেট ও সিডির যুগ পেরিয়ে সংগীত এখন ডিজিটাল এবং স্পটিফাই বা ইউটিউবের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গান এখন সহজে মানুষের কাছে পৌঁছালেও এর আর্থিক মূল্য মারাত্মকভাবে কমে গেছে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে টিকে থাকার জন্য সরাসরি মঞ্চ পরিবেশনার কোনো বিকল্প নেই।

জেমস উল্লেখ করেন, নতুন প্রজন্মের অনেক সংগীতশিল্পী তাঁদের সময়ের শিল্পীদের চেয়েও বহুগুণ বেশি প্রতিভাবান। কিন্তু প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ডিজিটাল স্ট্রিমিং থেকে গান প্রকাশ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং পেশাদার হিসেবে টিকে থাকা এখন অত্যন্ত কঠিন। তাই যারা সরাসরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রোতাদের সামনে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারবেন, শেষ পর্যন্ত তারাই সংগীতাঙ্গনে টিকে থেকে সর্বোচ্চ সুফল ঘরে তুলবেন। আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সৃজনশীলতায় কোনো বাধা সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন না তিনি।

তাঁর মতে, প্রযুক্তি শুধু গানেই নয় বরং প্রোগ্রামিং থেকে শুরু করে দৃশ্যমাধ্যম সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে শিল্পের বহু পুরনো মাধ্যম হয়তো সম্পূর্ণ বদলে যাবে বা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। তাই আধুনিক যুগে সংগীতশিল্পীদের সামনে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকে, তবে তাকে ভয় না পেয়ে সৃষ্টিশীলভাবে কাজে লাগানো উচিত।

দেশ-বিদেশে নিয়মিত কনসার্ট ও সফরের ব্যস্ততায় স্টুডিওতে পূর্ণাঙ্গ সময় দিতে না পারায় এই মুহূর্তে নয় বা দশটি গান নিয়ে কোনো একক অ্যালবাম প্রকাশের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি। তবে নতুন সৃষ্টির তাগিদ জাগলে যেকোনো সময় একক গান নিয়ে হাজির হবেন। তরুণ শিল্পীদের নিজের গান কাভার করা প্রসঙ্গে জেমস বলেন, সংস্কৃতি নদীর মতো নিজস্ব ধারায় প্রবহমান এবং গান মানুষ গাইবে বলেই সৃষ্টি হয়।

কথা প্রসঙ্গে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন এই রকস্টার। কবির লেখা বেশ কিছু অপ্রকাশিত গান সুর ও রেকর্ডিংয়ের অভাবে হারিয়ে গেলেও ‘তারায় তারায়’ গানটি এখনো মঞ্চে তাঁর পরিবেশিত সবচেয়ে প্রিয় গানের একটি। এ ছাড়া সারগাম স্টুডিওর স্মৃতিচারণ করে প্রয়াত গিটারবাদক নিলয় দাসের সাথে অতীতের হৃদ্যতা ও অকাল বিচ্ছেদের আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। বাংলা ব্যান্ডের আরেক মহাতারকা প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর সাথে নিজের বন্ধুত্বের স্মৃতি তুলে ধরেন জেমস।

তিনি জানান, দুজনের মধ্যে যেমন তীব্র সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল, তেমনি ছিল গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা ও একে অপরের রেকর্ডিং স্টুডিওতে সময় কাটানোর সেই সোনালী দিন এখন আর নেই। আধুনিক যুগে শিল্পীরা নিজেদের মুঠোফোন, কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপে বন্দি হয়ে এককভাবে কাজ করায় আগের মতো আন্তরিক যোগাযোগ ও আড্ডা হারিয়ে গেছে। রসিক ও প্রাণোচ্ছল আইয়ুব বাচ্চুর প্রস্থানকে এখনো মেনে নিতে নিজের কষ্টের কথা জানান তিনি।

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব না কষে দুঃখ ভুলে আনন্দ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সাথে তরুণ প্রজন্মের প্রতি এই ব্যান্ড তারকার আহ্বান, অর্থ, প্রভাব কিংবা জাগতিক ক্ষমতার মোহে নয়, সংগীতকে অন্তরের গভীর ভালোবাসা ও বিশুদ্ধ আগ্রহ থেকেই সাধনা করতে হবে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছাড়া কেবল বৈষয়িক লাভের উদ্দেশ্যে গান করতে এলে শেষ পর্যন্ত চরম হতাশা ছাড়া কিছুই মিলবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।