এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৯:৩১ এএম
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা বিভাগের এক সময়ের অত্যন্ত প্রতাপশালী কর্মকর্তা এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক প্রধান বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ অভিযোগ থাকলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পক্ষে একটি পরিকল্পিত ‘ইমেজ হোয়াইটওয়াশ’ বা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই সুসংগঠিত প্রচার নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে এবং গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, ‘ইটসমিস্বাধীন’ (ItsMeSwadhin) নামক একটি ফেসবুক প্রোফাইলসহ আরও কিছু সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বর্তমানে জিয়াউল আহসানের অপরাধ আড়াল করতে ‘অর্ধসত্য’ বা হাফ-ট্রুথ কৌশল ব্যবহার করছে। এই প্রচারণার মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা মনে করেন।
গুমের শিকার প্রকৌশলী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী জানিয়েছেন যে, জিয়াউল আহসানের ভাতিজা পরিচয় দিয়ে শেখ ফারদিন এহসান স্বাধীন নামের এক তরুণ গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছে। এই তরুণ নিজেকে ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবেও দাবি করে এবং ইনস্টাগ্রামেও জিয়াউল আহসানের পক্ষে সরব রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্তাধীন বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এই ধরণের প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দাখিলকৃত প্রসিকিউশনের তদন্ত প্রতিবেদনে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লোমহর্ষক সব তথ্য উঠে এসেছে। তাকে র্যাবের ‘কসাই’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ২০১১ সালের ১১ জুলাই গাজীপুরের পূবাইলে জিয়াউল আহসানের সরাসরি নির্দেশে তিনজনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এবং তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে পুরো অপারেশন তদারকি করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে জলদস্যু দমনের নামে বরগুনা ও বাগেরহাট এলাকায় অন্তত ৫০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হয়েছে।
এমনকি ২০১৪ সালের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান ঘাতক মেজর আরিফ হোসেনও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন যে, তিনি তৎকালীন র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসানের নির্দেশেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।তদন্তে আরও দেখা গেছে, জিয়াউল আহসানের ক্ষমতার অন্যতম বড় উৎস ছিল এনটিএমসি। তার নেতৃত্বে এই রাষ্ট্রীয় সংস্থাটিকে একটি ব্যক্তিগত নজরদারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বিরোধীদলীয় নেতা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত ফোনকল রেকর্ড ফাঁস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাক করার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমানে এনটিএমসির সার্ভার থেকে এমন অনেক অডিও ক্লিপ ও ডেটা উদ্ধার করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক নেতাদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ব্যবহৃত হতো। গত চব্বিশের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ‘আয়নাঘর’ থেকে মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগীরাও জিয়াউল আহসানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা বর্ণনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন কীভাবে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর তাদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বট ও ফেক প্রোফাইলের মাধ্যমে কৃত্রিম জনমত তৈরির এই প্রক্রিয়াকে ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ বলা হয়। প্রোপাগান্ডা সেলগুলো দাবি করছে যে, ‘আয়নাঘর’ কেবল একটি কাল্পনিক নাটক এবং জিয়াউল আহসান না থাকলে বাংলাদেশ নাকি ‘তালেবানি রাষ্ট্র’ হয়ে যেত। হলি আর্টিজান অপারেশনের সাফল্যের দোহাই দিয়ে তার পরবর্তী এক দশকের অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া তার বার্ধক্য বা অসুস্থতার দোহাই দিয়ে তাকে জনসমক্ষে অসহায় হিসেবে চিত্রায়িত করার একটি মানসিক প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা গেছে।
পারিবারিক আবেগ ব্যবহার করে শত শত গুম ও খুনের অভিযোগকে আড়াল করার এই ডিজিটাল অপচেষ্টাকে নির্যাতিতরা তাদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন।বিচারের অগ্রগতির বিষয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। আদালত তার অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ইউনিভার্সিটির গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন যে, বিচার প্রক্রিয়া কেবল আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। রাজপথের চোখ রাঙানি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোপাগান্ডা দিয়ে আদালতকে প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি মনে করেন, যারা গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন