বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,

দারিদ্র্যের তীব্র ঝুঁকিতে ছয় কোটি নিম্ন মধ্যবিত্ত

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

দারিদ্র্যের তীব্র ঝুঁকিতে ছয় কোটি নিম্ন মধ্যবিত্ত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে গত এক বছরের ব্যবধানে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরমভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়।

সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিগত চার বছরে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে যেখানে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর এই বিশাল অংশকে অবিলম্বে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে না পারলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।

এগুলো হলো কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা, তীব্র জ্বালানি সংকট, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বল গতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল কর ও বৈষম্যমূলক ভর্তুকি ব্যবস্থা।

মহামারির সময় স্থবিরতার কারণে বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারান।

পরবর্তীতে সামগ্রিক অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পরিবেশ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, করোনাকালে কাজ হারানো কর্মজীবীদের বড় অংশই পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে আর ফিরতে পারেননি।

তিনি উল্লেখ করেন, এর সাথে আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট জাতীয় অর্থনীতির ওপর মারাত্মক বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার পর তৈরি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।

একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিল্প উৎপাদনে, যা নতুন করে শ্রমিক ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দেশে টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষ চরম মূল্যস্ফীতির বোঝার নিচে পিষ্ট হচ্ছে।

গত দুই বছরের তুলনায় কিছুটা কমে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩ শতাংশে অবস্থান করলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমার মধ্যে আসেনি।

জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য লাগামহীন বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর টিকে থাকার ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক পরিবার আগের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে এবং কেউ কেউ স্থাবর সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

আয় হ্রাস ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংক। রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর ব্যবস্থাপনার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, সমন্বিত করদাতা তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং কর পরিপালন কঠোর করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

এদিকে দরিদ্রদের জন্য পরিচালিত সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন খাতের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির বণ্টন নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির পরিসংখ্যানে বেরিয়ে এসেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ সরকারের প্রধান প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোনো সুবিধাই পান না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব দরিদ্র মানুষ এই সুবিধা পান, তাদের প্রাপ্ত বরাদ্দের আর্থিক পরিমাণ বিত্তবানদের চেয়ে অনেক কম।

দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ৭ হাজার ১৪০ টাকার সমপরিমাণ সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা পান। এর বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার রাষ্ট্রীয় নানা চ্যানেল থেকে গড়ে বছরে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা সুবিধা ভোগ করে।

বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ক্ষেত্রেও এই চরম বৈষম্যের প্রতিফলন দেখা গেছে।

উচ্চমাত্রায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করার কারণে ধনী পরিবারগুলোই সরকারি ভর্তুকির সিংহভাগ টেনে নিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিদ্যুৎ খাতে রাষ্ট্রের দেওয়া মোট ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হচ্ছে দেশের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের পেছনে।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন অভিমত দেন, সবার জন্য ঢালাও ভর্তুকি বন্ধ করে সুনির্দিষ্টভাবে প্রান্তিক ও প্রকৃত দরিদ্রদের চিহ্নিত করে সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা জানান, সরকারের ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা যদি আধুনিক ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছানো যায়, তবে প্রতি বছর সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব। অথচ বর্তমান অপরিকল্পিত ব্যবস্থায় এই সংখ্যা মাত্র ১৬ লাখে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

দারিদ্র্য বৃদ্ধির সমান্তরালে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও নিম্নমুখী।

২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেখানে ৭ দশমিক ১ শতাংশ ছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা মারাত্মকভাবে কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২২ শতাংশে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি আরও সংকুচিত হয়ে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আনুষ্ঠানিক তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। কয়েক দশক ধরে দারিদ্র্য ধারাবাহিকভাবে কমে আসার ইতিবাচক ধারার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আবারও বিপজ্জনক গতিতে বাড়তে শুরু করেছে।

উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিপ্রণেতারা।

সরকারের দাবি, চলমান অর্থনৈতিক জটিলতার সিংহভাগই পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাবও এর সাথে যুক্ত।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংক খাত এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট মূলত পূর্ববর্তী সরকারের দীর্ঘদিনের নীতিগত অব্যবস্থাপনার ফল।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশে গ্যাস ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের নীতি ও সংস্কারসংক্রান্ত সুপারিশগুলোকেও সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা