জুলাই ২৮, ২০২৫, ০২:৩০ পিএম
বাংলাদেশে রামবুটান ফল চাষ একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে এর বাজার মূল্য প্রতি কিলোগ্রাম ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা, যা এই ফলকে অত্যন্ত লাভজনক করে তুলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১০ বিঘা জমিতে ৩০০টি গাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব, যেখানে প্রতিটি গাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার ফলন পাওয়া যেতে পারে।
ভিডিওতে প্রদর্শিত "তাইফ এগ্রো" খামারটি প্রায় ২০ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই জমি লিজ নেওয়া হয়েছে এবং জমির মালিককে বার্ষিক ভাড়া প্রদান করা হয়। খামারটি প্রায় ৪.৫ বছর ধরে চালু আছে এবং এখানে ২০০টিরও বেশি রামবুটান গাছ লাগানো হয়েছে। খামারে গরুর লালন-পালনও করা হয় (সাধারণত একবারে ১০টির বেশি নয়) সারের জন্য গোবর উৎপাদনের উদ্দেশ্যে।
রামবুটানকে বাংলাদেশে একটি নতুন ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার ভালো বাজার মূল্য, সুন্দর চেহারা এবং সুস্বাদু স্বাদের কারণে উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। ফলটি সারা বছর পাওয়া যায়, কিছু ফল পাকছে, কিছু সবুজ আছে বা নতুন ফুল ফুটছে।
চারা রোপণ ও পরিচর্যা: বীজ থেকে চারা তৈরি না করে কলম চারা রোপণ করার জন্য অত্যন্ত সুপারিশ করা হয়। কলম চারা মাতৃগাছের গুণগত মান বজায় রাখে, যেখানে বীজ থেকে জন্মানো ফল ছোট হতে পারে, বড় বীজ থাকতে পারে এবং ভোজ্য অংশ বীজ থেকে সহজে আলাদা নাও হতে পারে। এছাড়াও, ৮০-৯০% বীজ থেকে জন্মানো গাছ পুরুষ হতে পারে, যার অর্থ তারা ফল দেবে না। রোপণের প্রায় ১.৫ বছর পর ফল দেখা যায়। গাছগুলো ৭০-৮০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে, যা বাংলাদেশের লিচু গাছের মতোই।
মাটি ও প্রস্তুতি: বাংলাদেশের আবহাওয়া স্থিতিশীল হওয়ায় দেশের বেশিরভাগ অংশে এই ফল চাষ করা যায়। আদর্শ মাটির ধরন হলো বেলে দোআঁশ এবং এঁটেল দোআঁশ; বিশুদ্ধ বেলে মাটি কম উপযুক্ত। রোপণের জন্য ১.৫ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়তে হবে। খননকৃত মাটির অর্ধেক সমপরিমাণ কোকোপিট (কোকোপিট না থাকলে ধানের তুষ বা কাঠের গুঁড়া), গোবর, ভার্মিকম্পোস্ট এবং ১০০ গ্রাম দানাদার কীটনাশকের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করতে হবে। শীতকালে গাছের গোড়ার চারপাশে আগাছা পরিষ্কার করা এড়িয়ে চলতে হবে যাতে সূক্ষ্ম শিকড় সুরক্ষিত থাকে; শুধুমাত্র গাছে জল দিতে হবে। চারা সারা বছর রোপণ করা যায়, তবে শীতকালে ঠান্ডা ও শিশির থেকে রক্ষা করার জন্য প্লাস্টিকের শীট দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। প্রথম বছরে ছোট গাছ থেকে ফল না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে গাছ আরও শক্তিশালী হয়, যা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও প্রচুর ফলনের দিকে নিয়ে যাবে।
ফলন: প্রথম ফসল তোলার সময় (৪.৫ বছর পর) কিছু গাছ ৫-১০ কেজি ফলন দিয়েছে। বর্তমানে, গাছগুলো গড়ে ৫০ কেজি ফলন দিচ্ছে, কিছু গাছ ১০০ কেজি, ২০ কেজি, ৫০ কেজি, ৬০ কেজি বা ৭০ কেজি ফলন দিচ্ছে।
বাজার ও বিক্রয়: বাংলাদেশে রামবুটানের চাহিদা বেশি, কারণ এটি একটি আমদানি করা ফল যা পরিবহনের সময় প্রায়শই রঙ হারায়, স্থানীয় তাজা উৎপাদনের মতো নয়। খামারটি গত বছর প্রতি কেজি রামবুটান ১৮০০ টাকায় এবং এই বছর ১৬০০ টাকায় বিক্রি করেছে। বিক্রয় মূলত অনলাইনে পরিচালিত হয়, গ্রাহকরা অর্ডার করার জন্য ফোন করে বা সরাসরি খামারে আসেন।
চারা: কলম রামবুটান চারা বিক্রয়ের জন্য উপলব্ধ। চারার দাম বর্তমানে ২২০০ টাকা, যদিও আমদানি খরচ এবং ডলারের ওঠানামার কারণে এটি পরিবর্তিত হতে পারে। সঠিক জাত নিশ্চিত করার জন্য চারা আমদানি করা হয়। এক বিঘা জমির জন্য (৩৩ শতাংশ) প্রায় ৩৩টি চারা প্রয়োজন (প্রতি শতাংশে একটি)। ভিডিওতে দেখানো চারাগুলো তিন বছর বয়সী হলেও ব্যাগে থাকায় ছোট দেখাচ্ছে; মাটিতে রোপণের পর তাদের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত হয়।
চাষের জন্য লক্ষ্য দর্শক: যাদের বাড়ির উঠানে ছোট প্লট জমি আছে তারা ৪-৫টি গাছ লাগাতে পারেন। যাদের বড় ছাদ আছে তারাও বড় পাত্রে রামবুটান চাষ করতে পারেন। যে কৃষকদের পতিত বা উঁচু জমি আছে যা অন্যান্য ফসলের জন্য উপযুক্ত নয়, তারা বাণিজ্যিক চাষের কথা বিবেচনা করতে পারেন। বিনিয়োগকারীরা যারা ভবিষ্যতের শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি কিনেছেন কিন্তু বর্তমানে তা খালি রাখছেন, তারা এটিকে একটি অস্থায়ী শিল্প হিসেবে রামবুটান চাষের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। এই ব্যবসায় ধৈর্যের প্রয়োজন, কারণ প্রথম তিন বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো আয় হবে না, এই সময়ে ক্রমাগত যত্ন ও বিনিয়োগের প্রয়োজন।
অন্যান্য ফল: খামারে লংগানও চাষ করা হয়, বিশেষ করে "ডায়মন্ড রিভার" জাত, যা বাণিজ্যিক চাষের জন্য উপযুক্ত। লংগান ফল গুচ্ছাকারে জন্মায়, প্রতিটি গুচ্ছের ওজন ১ কেজির বেশি হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন