অক্টোবর ৭, ২০২৫, ০১:৩৪ পিএম
রাত ফুরিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই পাহাড়ের সর্পিল পথ ধরে ছুটে চলছিল আমাদের বাস। পথের পাশেই শত শত ফুট গভীর খাদ, আর দূরে মেঘেরা খেলা করছিল সবুজ পাহাড়ের চূড়ায়। এভাবেই শহুরে কোলাহল পেছনে ফেলে আমরা প্রবেশ করছিলাম পাহাড়, নদী আর মেঘের দেশ বান্দরবানে। এটি আমাদের লামার গহিনে, মাতামুহুরীর বাঁকে আর মেঘের রাজ্য মিরিঞ্জা ভ্যালিতে হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
প্রথম দিন: ঝিরিপথে হারাই নেটওয়ার্ক, খুঁজি নিজেকে প্রায় ১১ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে আমরা যখন লামা বাস টার্মিনালে পৌঁছালাম, সকালের স্নিগ্ধ রোদ আর পাহাড়ের হাতছানি নিমিষেই ভুলিয়ে দিল সব ক্লান্তি। আমাদের গন্তব্য ছিল পাহাড়ের চূড়ায় এক নির্জন রিসোর্ট। সেখানে পৌঁছে কিছুক্ষণ জিরিয়েই বেরিয়ে পড়লাম অজানার পথে। পাহাড়ি গ্রাম, তাদের সহজ-সরল জীবনযাত্রা দেখতে দেখতে উঠে গেলাম সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টার চূড়ায়।
সেখানেই পেলাম ঝুম বৃষ্টি। চূড়া থেকে দেখলাম মেঘেদের বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার সেই স্বর্গীয় দৃশ্য। এরপর শুরু হলো আসল অভিযান—ঝিরিপথে হাঁটা। দুই পাশে খাড়া পাহাড়, নিচে শীতল স্বচ্ছ পানির স্রোত আর পাথরের বিছানা। কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই আবিষ্কার করলাম, আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি নেটওয়ার্ক থেকে। নেই কোনো নোটিফিকেশনের শব্দ, নেই শহরের যান্ত্রিক কোলাহল। ছিল শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পানির কলকল ধ্বনি।
প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সেই নেটওয়ার্কবিহীন স্বর্গীয় পথে হেঁটে সন্ধ্যায় যখন রিসোর্টে ফিরলাম, মনে হলো নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছি।দ্বিতীয় দিন: মাতামুহুরীর বুকে বিষাদের সুর দ্বিতীয় দিনের সকালটা ছিল লামা বাজার, পাহাড়ি ফল আর বহমান মাতামুহুরী নদীর জন্য। ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে আমরা ভেসে পড়লাম নদীর বুকে।
দুই পাশে খাড়া পাহাড়ের সারি, আর তার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে মাতামুহুরী। প্রকৃতির সেই জাদুকরি রূপে মুগ্ধ হয়ে আমরা যখন সাদা পাথরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই এক দুঃসংবাদ আমাদের যাত্রা থামিয়ে দেয়। জানতে পারলাম, এক পর্যটক নদীতে নেমে নিখোঁজ হয়েছেন। উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ায় আমাদের পথ বন্ধ হয়ে গেল। মন খারাপ করে আমরা ফিরে এলাম, দূর থেকেই উপভোগ করলাম নদীর বিষণ্ণ সৌন্দর্য।
তৃতীয় ও শেষ দিন: মেঘের রাজ্যে মেঘ ছুঁয়ে দেখা আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল ‘দ্বিতীয় সাজেক’ নামে পরিচিত মিরিঞ্জা ভ্যালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উঁচু এই পাহাড়ের চূড়াই ছিল আমাদের লক্ষ্য। বৃষ্টির কারণে পিচ্ছিল আর খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেকিং শেষে যখন চূড়ায় পৌঁছালাম, শরীর ক্লান্ত হলেও মন ভরে গেল মেঘেদের রাজ্যে এসে। ভোরের আলো ফুটতেই চোখ মেলে দেখি, মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে আমাদের কটেজের বারান্দায়।
হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যায় তুলোর মতো মেঘ। ছোটবেলায় মায়ের কোলে শুয়ে মেঘের রাজ্যে ঘুরে বেড়ানোর যে কল্পনা করতাম, আজ তা বাস্তবে ধরা দিল। এরপর পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঝরনার শীতল পানিতে শরীর ভেজাতেই মুছে গেল ফেরার সব ক্লান্তি। প্রকৃতির গহিনে হারিয়ে গিয়েছিলাম যে কটা দিন, তার স্মৃতি নিয়েই আবার ফিরে এলাম যান্ত্রিক শহরে, নতুন করে বাঁচার শক্তি নিয়ে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন