শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

বাংলা সাহিত্যে ঈদের প্রতিফলন: কবিতা ও কথাসাহিত্য

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

মার্চ ২৩, ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

বাংলা সাহিত্যে ঈদের প্রতিফলন: কবিতা ও কথাসাহিত্য

বাংলা সাহিত্যে ঈদের আবহ

হিজরি দ্বিতীয় সালে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদের সূচনা হলেও বাংলা সাহিত্যে এর প্রাতিষ্ঠানিক ও শৈল্পিক বিবর্তন শুরু হয় বিশ শতকের গোড়ার দিকে। মদিনাবাসীর প্রাচীন উৎসব নওরোজ ও মেহেরজানের পরিবর্তে প্রবর্তিত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা কালক্রমে বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। 

ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে ঈদ এখন ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের এক সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে যা আমাদের জাতীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলা ঈদসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম কবিতা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও ১৯০২ সালে মুন্সী মোহাম্মদ আসাদ আলীর ঈদুল আজহা কবিতাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। 

তবে ১৯০৩ সালে সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত মাসিক নবনূর পত্রিকায় প্রকাশিত ঈদ কবিতাটিকে অধিকাংশ গবেষক প্রথম সার্থক সাহিত্যিক সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করেন।

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও ইসলামের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা উঠে এসেছে আল্লামা ইকবাল ও কবি কায়কোবাদের লেখনীতে। কায়কোবাদ তার কবিতায় সব ভেদাভেদ ভুলে মিলনের গান গাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে কবি গোলাম মোস্তফার লেখনীতে ঈদের চাঁদ হয়ে উঠেছে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের প্রতীক। তবে বাংলা সাহিত্যে ঈদকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এবং জাতীয় চেতনায় গেঁথে দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে গানটি ছাড়া বাঙালির ঈদ আনন্দ আজও অপূর্ণ থেকে যায়। 

নজরুল কেবল উৎসবের আনন্দ নয় বরং কৃষকের ঈদ কবিতার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের ক্ষুধার জ্বালা ও বঞ্চনার চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তী সময়ে ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদের কবিতায় ঈদের স্মৃতি ও নস্টালজিয়া ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।কবিতার পাশাপাশি বাংলা কথাসাহিত্যেও ঈদের বহুমাত্রিক রূপ চিত্রিত হয়েছে। ইবরাহীম খাঁর পুটু গল্পে অবলা প্রাণীর প্রতি মানুষের মমত্ববোধের জয়গান গাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মূর্তজা বশীরের লাল লুঙ্গি গল্পে ফুটে উঠেছে একজন রিকশাচালক বাবার করুণ আর্তনাদ যে শত চেষ্টা করেও তার সন্তানের সামান্য আবদার পূরণ করতে পারে না। 

সৈয়দ শামসুল হকের সাহেবচান্দের ঈদভোজন গল্পে দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ও তীব্র সামাজিক বৈষম্যের এক সংঘাতময় চিত্র দেখা যায়। একইভাবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ঈদ গল্পে চৌধুরী বাড়ির গৃহকর্মী ফাতিমা ও তার ছেলে রজবের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে সমাজের নির্মম ও বৈষম্যমূলক বাস্তব। ধনীর ফেলে দেওয়া ছেঁড়া জামা পরে নামাজ পড়তে গিয়ে রজবের যে মানসিক যন্ত্রণা তা আমাদের সমাজের গভীর ক্ষতকে নির্দেশ করে। এভাবে বাংলা সাহিত্য কেবল উৎসবের রঙে নয় বরং সাম্য ও মানবতার জয়গানে ঈদকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।