শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ—এই প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে বিশ্বমঞ্চে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সার্বিক রূপরেখা ও নীতিগত অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের মৌলিক নীতি ও সনদের মূল্যবোধের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেলে তিনি এই ভাষণ দেন।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন ও মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে, নারীরা যেন পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে নিরাপদ জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু যাতে বৈষম্যহীন পরিবেশে সম্ভাবনাময় হয়ে গড়ে ওঠে—এমন একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মজবুত ভিত্তির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ জাতীয় উন্নয়নের ধারাকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। 

তিনি বলেন, দেশের আপামর জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ। দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।

নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী হতে পারে না বলে তিনি জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। দেশে বিদ্যমান জনমিতিক লভ্যাংশ বা তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিপুল সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা, ব্যাপক ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। উদ্ভাবনী তরুণ সমাজকে উৎসাহিত করতে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের গবেষণা সহায়তায় চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সরকারি তহবিলে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার কেবল ভোটের গণতন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির সুফল যেন প্রতিটি সাধারণ পরিবার ও প্রান্তিক নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাই প্রধান উদ্দেশ্য। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় তাদের সার্বিক শিক্ষাদীক্ষা, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগকে জাতীয় পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরাসরি নগদ অর্থায়নের সুযোগ প্রসারিত করা হয়েছে এবং নারীদের জন্য স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনাবেতনে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ডের মতো সুরক্ষা কর্মসূচি চালু হয়েছে। পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড বরাদ্দের উদ্যোগকে তিনি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেন। ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতের এই বিশেষ কার্ডগুলোকে একটি একক সর্বজনীন কার্ডের অধীনে সমন্বিত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে প্রকাশ করেন।

শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের হার মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মমুখী ও আধুনিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর জোর দিয়ে নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সাথে প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ, পোশাক এবং বিনামূল্যে মানসম্মত দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খেলাধুলাকে আনুষ্ঠানিক পেশা হিসেবে রূপ দিতে জাতীয় শিক্ষা সিলেবাসে শারীরিক শিক্ষাকে আবশ্যক বিষয় করা হয়েছে, যার ইতিবাচক ফল হিসেবে গত জুন মাসে সারাদেশে মাসব্যাপী আয়োজিত স্কুল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমান প্রশাসন শহর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার উন্নয়ন বৈষম্য হ্রাস করে অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বদ্ধপরিকর। সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির সাথে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্তত ৭৩ শতাংশ লক্ষ্যের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ সামঞ্জস্য রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, মানবসভ্যতা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু এই আধুনিক প্রযুক্তির সুফল এখনো আন্তর্জাতিক পরিসরে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তিগত বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মারাত্মক বৈষম্যে রূপ না নেয়। 

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক উদ্ভাবনে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিতে জাতিসংঘের কার্যকর বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মসৃণ উত্তরণের জন্য সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ধারাবাহিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মহামারি পরবর্তী এই জটিল বাস্তবতায় কোনো দেশ একা সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না; আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ বৃদ্ধি ও অর্থবহ অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই কেবল সমৃদ্ধি সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলমান সংঘাত, রক্তপাত ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, যেকোনো বৈশ্বিক বিরোধের একমাত্র সমাধান পারস্পরিক সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও সহযোগিতামূলক সমঝোতা। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। এই লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘকে একটি কার্যকর সমঝোতামূলক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বশান্তির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন। একই সাথে তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি সার্বভৌম স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অটল সমর্থন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতিকে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক চাপ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে, সুতরাং এর টেকসই ও স্থায়ী সমাধানও সেখানেই নিহিত রয়েছে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনই একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। সেই চূড়ান্ত সমাধান কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক হুমকির মুখে থাকা বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরে আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে ন্যায়সঙ্গত জলবায়ু অর্থায়ন ও বাস্তবসম্মত অভিযোজন সহায়তার জন্য বিশ্ব ফোরামে জোরালো পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশের সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং খরা ও আকস্মিক বন্যা প্রতিরোধে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। সেই সাথে সুন্দরবনের মিষ্টি পানির প্রবাহ রক্ষা ও বৃহৎ পানি সংরক্ষণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের আন্তর্জাতিক ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষরের তথ্যও তিনি বিশ্বনেতাদের জানান।

আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়মিত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতের দাবি জানানোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি। প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি নারী সদস্যদের সাহসী ও দক্ষ অংশগ্রহণ বৈশ্বিক নারী ও শান্তি সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রমাণ বলে তিনি মত দেন। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের অবিচল থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

তথ্যসূত্র: বাসস