সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণের প্রশংসা করে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবন থেকে পাঠানো এক বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। অভিনন্দন বার্তায় রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী একটি দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ উপস্থাপন করেছেন। সেই সময়োপযোগী ভাষণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান উজ্জ্বল হয়েছে বলে তিনি অভিমত দেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে সাধারণ অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় বক্তব্য প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যের শুরুতে তিনি ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তিনি বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বায়েরবককেও সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান। ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাসকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের সকল শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
একই সঙ্গে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী সবার অবদান স্মরণ করে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানান। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনের পথ ধরে বর্তমান বাংলাদেশকে তিনি ফ্যাসিবাদমুক্ত হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
তিনি দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রসঙ্গে বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে দেশের জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই অর্জনের জন্য তিনি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রতি অভিনন্দন জানান। একই সাথে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, জনগণই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই একই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর পিতা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনিও আজ দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এবং একটি শান্তিময় আন্তর্জাতিক সমাজের প্রত্যাশায় এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে যেকোনো প্রান্তের সংকটের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি দেশে এসে পড়ে। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বহু দেশে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, বিপুল জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে এবং নতুন নতুন মানবিক বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মক চাপের সম্মুখীন হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলছে।
সংঘাত সমাধানের পথ বাতলে তিনি বলেন, যেকোনো বৈশ্বিক বিরোধের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং মর্যাদা বজায় রাখাই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া সমীচীন। তিনি প্রত্যাশা করেন, বিশ্ব সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে মারণাস্ত্রের বদলে যুক্তি, কূটনীতি, আধুনিক শিক্ষা ও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দেবে। উন্নয়ন খাতের অর্থ সামরিক খাতে স্থানান্তর বিশ্বশান্তির প্রধান অন্তরায় বলে উল্লেখ করে তিনি সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
চলমান অধিবেশনের প্রতিপাদ্যকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাসী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জাতিসংঘের পিসবিল্ডিং কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি ও সংঘাত প্রতিরোধে কাজ করে চলেছে। প্রতিকূল পরিবেশেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারী সদস্যদের সাহসী অংশগ্রহণ নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা এগিয়ে নিতে দেশের অঙ্গীকার প্রমাণ করে। এছাড়া বাংলাদেশ এ বছর উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণার ৪০তম এবং ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের ওপর জোর দিয়ে তিনি অভিবাসীদের অধিকার ও কল্যাণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা আহ্বান জানান।
দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময় ধরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংকটকে তিনি দেশের পরিবেশ, সম্পদ ও নিরাপত্তার ওপর একটি মারাত্মক বোঝা হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি স্পষ্ট করেন, এই সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও তাদের মাতৃভূমিতেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান। প্রত্যাবাসন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক সহায়তা চালু রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় বৈশ্বিক ঝুঁকিতে রূপ নেবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি কপ-৩১ সম্মেলনে ন্যায়সঙ্গত জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তা দাবি করেন। তিনি জানান, দেশের ভেতরে পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, সৌরশক্তি সম্প্রসারণ এবং বন্যা ও খরা প্রতিরোধে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানো ও পানি সংরক্ষণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বজায় রাখতে সরকার ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ক্ষত কাটিয়ে দেশকে পুনর্গঠন করতে সরকার পুনরুদ্ধার, পুনরুজ্জীবন ও পুনর্নির্মাণ অর্থাৎ তিন আর কৌশল বাস্তবায়ন করছে। জনমিতিক লভ্যাংশ বা তরুণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে একটি উৎপাদনশীল শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের বিস্তারিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষক ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী হওয়ায় প্রতিটি আর্থসামাজিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে তাদের রাখা হয়েছে। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়নের পাশাপাশি স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড। পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন জোরদার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সব সেবা সমন্বয় করে একটি সর্বজনীন কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখা সরকারের কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই কর্মসূচির সাথে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্তত ৭৩ শতাংশ সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ পরোক্ষভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে এই বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। শিক্ষায় নৈতিকতা ও কর্মমুখী কারিগরি কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি প্রাথমিকে বিনামূল্যে পোশাক, ব্যাগ ও দুপুরের খাবার চালু করা হয়েছে। পাঠ্যক্রমে ক্রীড়াকে বিষয় হিসেবে যুক্ত করার সুবাদে আয়োজিত ফুটবল প্রতিযোগিতায় ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানবজাতি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জীবপ্রযুক্তির নতুন যুগে প্রবেশ করছে। প্রযুক্তিগত বিভাজন যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন বৈষম্যে রূপ না নেয়, সেজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সাশ্রয়ী সুবিধা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের একটি সামগ্রিক ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নকে তিনি সময়ের দাবি বলে অভিহিত করেন।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য প্রবেশাধিকার এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক বৈশ্বিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিটি দেশের একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ওষুধ, প্রতিষেধক ও চিকিৎসা সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও মত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি সবার জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন