সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে সাথী ফসল চাষ এবং জৈব প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ ঘটিয়ে বিষমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সাফল্য পাচ্ছেন কৃষকেরা।
একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের মাধ্যমে জমি খালি না রেখে বছরজুড়ে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন স্থানীয় চাষিরা। শাহজাহানপুর উপজেলার চাঁদবাড়িয়া গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা এই বহুমুখী চাষপদ্ধতির সাথে যুক্ত হয়েছেন। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় পরিচালিত কৃষি ও গ্রামীণ খাতের রূপান্তর প্রকল্পের (আরএমটিপি) আওতায় বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করছে। বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ, ধুনট এবং শাহজাহানপুর—এই চার উপজেলার প্রায় ১১ হাজার কৃষককে পরিবেশবান্ধব কৃষির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ প্যাকেজের আওতায় আনা হয়েছে। উদ্যোগটির অংশ হিসেবে চাঁদবাড়িয়া গ্রামের ৬০ থেকে ৭০ জন চাষি একটি সমবায় সমিতির মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে ৩০ একরের বেশি অর্থাৎ প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে বিষমুক্ত সবজি আবাদ করছেন।
তারা নিয়মিত সাপ্তাহিক ও মাসিক বৈঠকের মাধ্যমে চাষাবাদের কৌশল নির্ধারণ করেন। চাষিরা জানান, প্রকল্পের পরামর্শে প্রথমে মাটির উর্বরতা ও উপাদান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের উপস্থিতি ও জৈব সারের মারাত্মক ঘাটতি ধরা পড়ে। এরপর থেকে তারা বাড়িতে তৈরি জৈব সার এবং কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্টের ব্যবহার বাড়িয়ে দেন। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পেয়ে ফসলের লাভ বেড়েছে।
৫০ শতক জমিতে করোলা আবাদের পর একই সাথে শসা এবং পরবর্তী ধাপে চায়না জাতের শিম চাষ করে সফল হয়েছেন স্থানীয় এক কৃষক। তিনি জানান, তার ক্ষেতে শিম তিন মাসের বেশি স্থায়ী হবে এবং প্রক্রিয়াজাত করার পর পাইকাররা সরাসরি মাঠ থেকেই তা সংগ্রহ করছেন। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি শিম প্রায় দেড়শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আরেক চাষি জানান, তিনি ২০ শতাংশ জমিতে ১৭৬ থেকে ১৮০টি জিনাইন জাতের কলাগাছের সাথে সাথী ফসল হিসেবে একই সাথে ফুলকপি ও পেঁয়াজ চাষ করেছেন। কলার বাগানে প্রথম দফায় ফুলকপি ও পেঁয়াজ বিক্রি করে তিনি ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পান, যা কলার সম্পূর্ণ পরিচর্যা ব্যয় মিটিয়ে দেয়। পরে কলার ফসল বিক্রি করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জিত হয়।
চলতি মৌসুমে ফুলকপি থেকে ইতোমধ্যে ৩০-৩২ হাজার টাকা বিক্রির পর অবশিষ্ট সবজি থেকে আরও ১০ হাজার টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি। কলার পাতা বড় হয়ে ছায়াযুক্ত হওয়ার আগে পেঁয়াজের বীজ বপন এবং পরবর্তীতে ছায়াযুক্ত জমিতে আদা রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছেন ওই চাষি। কীটনাশকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে জমিতে বিভিন্ন ধরনের আঠালো ফাঁদ এবং ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ফসলের সুরক্ষা বাড়াতে সবজি মাচার চারপাশে পোকা প্রতিরোধক কৌশল হিসেবে গাঁদা ও তুলসী গাছ লাগানো হয়েছে। আগে যেখানে বেগুন বা অন্যান্য সবজিতে প্রতিদিন বিষ দিতে হতো, এখন আট থেকে দশ দিনে একবারের বেশি স্প্রে করতে হয় না। মাচায় করোলা চাষের পাশাপাশি নিচে টমেটো আবাদ করে একই জমি থেকে তিনটি আলাদা ফসল তোলা হচ্ছে। তিনটি ফসল ওঠার পর জমি ১৫ দিন পতিত রাখা হয়। এ সময় মাচা ভেঙে জমিতে ব্লিচিং পাউডার, ডলোচুন ও কেঁচো সার প্রয়োগ করে মাটি শোধন করা হয়। পরবর্তীতে আট দিন অন্তর হালচাষ দিয়ে ১৫ দিনের মাথায় নতুন ফসল রোপণ করা হয়।
উৎপাদিত সবজি সরাসরি বাজারজাত করতে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে কৃষকদের সাথে সুপারশপগুলোর সরাসরি সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় নির্দিষ্ট কালেকশন সেন্টার ও নিরাপদ সবজির নিজস্ব আউটলেট গড়ে তোলা হয়েছে। পচনশীল এসব সবজি তাজা রাখতে আউটলেট পরিচালকদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সংরক্ষণ সামগ্রীর সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন