অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
সীমিত আয় আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নতুন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জোরালো হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মন্ত্রিসভা নবম পে স্কেল অনুমোদন করার পর বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর চাপ তীব্র হয়েছে। বিপরীতে বৈশ্বিক বাজারে উৎপাদন খরচের অনুপাতে তৈরি পোশাকের দাম না বাড়ায় কারখানা পরিচালনায় চাপে রয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এই সংকটময় বাস্তবতার মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্তে ইতিবাচক সম্মতি দিয়েছেন পোশাক কারখানার মালিকরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব বলছে, বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশীয় উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতে এই রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন। জাতীয় অর্থনীতি ও সামগ্রিক কর্মসংস্থানেও এই খাতের প্রভাব অপরিসীম।
২০২৪ সালের একটি খতিয়ানে উঠে এসেছে, দেশে ছোট, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সচল পোশাক কারখানা রয়েছে, যেখানে কাজ করছেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার ক্ষেত্রেও তৈরি পোশাকশিল্প সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে, কারণ এই মোট শ্রমিকের প্রায় ৬২ শতাংশই নারী।
কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মতো পোশাক শ্রমিকদের সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। জীবনযাত্রার এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা সরকারি কর্মচারীদের নবম পে স্কেল অনুমোদন দেয়। এর পরপরই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি তীব্র আকার ধারণ করে।
এর আগে ২০১৮ সালের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সর্বশেষ পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই সময় ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ছিল চার হাজার ৫০০ টাকা বা ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
বকেয়া পাওনা পরিশোধ ও ন্যূনতম মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় টানা ছয় দিন ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে শ্রমিকদের একাংশ। আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট উত্তেজনার মুখে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার পরও কেন শিল্পাঞ্চলে এমন অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষ ও সাধারণ শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এরই মধ্যে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। চলতি মাসের মধ্যেই এই বোর্ড গঠিত হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী, শ্রম সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদার, পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং নিট পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতি বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মধ্যে একটি সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই মালিকদের দুই প্রধান সংগঠনের সম্মতিতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়।
মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ চলার পরও রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকা নিয়ে শিল্পমালিকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। মালিকপক্ষের দাবি, গত ৭ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। এরপর গত ১২ অক্টোবর থেকে উত্তরায় নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। ১৭ অক্টোবর আন্দোলনের পঞ্চম দিনে পরিস্থিতি সংঘাতময় রূপ নেয়, যার জেরে সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও যানজট তৈরি হয়ে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়।
এরপর গত ১৫ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধির সমন্বয়ে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সদস্যদের নাম আহ্বান করে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়। সরকারের এই আইনি প্রক্রিয়ার পরও ১৬ ও ১৭ অক্টোবর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে উদ্যোক্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সরকার আগেই ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে এবং মালিকপক্ষও তাতে আনুষ্ঠানিক সম্মতি জানিয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকার যখন মজুরি বোর্ড গঠনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে, তখন রাস্তায় নেমে সহিংস আন্দোলনের কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না।
একই অবস্থান জানিয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ উভয় সংগঠনই মজুরি সমন্বয়ের বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগে যখন মালিকরা সম্পূর্ণ একমত এবং সরকারের সঙ্গে বসে বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তখন নতুন করে কারখানা এলাকা অস্থিতিশীল করার পেছনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়।
শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও শিল্পাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে গার্মেন্টস ফেডারেশন ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির আহ্বায়ক মির্জা আল শামীম বলেন, উত্তরার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে বাইরে থেকে একটি মহল এই কর্মসূচিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারখানা থেকে শ্রমিকদের জোর করে টেনে রাস্তায় নামানো হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানো এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পথ হতে পারে না। এসব তৎপরতার পেছনে ভিন্ন কোনো অশুভ উদ্দেশ্য রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে বামপন্থি কয়েকটি সংগঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও মালিকপক্ষ ও ট্রেড ইউনিয়নের একাংশ অভিযোগ করেছে। তবে এ বিষয়ে অবস্থান জানার জন্য গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
আন্দোলনের মুখে নিরাপত্তা বিবেচনায় উত্তরায় অন্তত ছয়টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছিল কর্তৃপক্ষ। কারখানাগুলোর তালিকায় ছিল ওলিও অ্যাপারেলস, ভার্সেটাইল অ্যাপারেল, এমব্রেলা, ডেজলিং ড্রেসেস, নাইস অ্যাপারেল এবং ভার্সেটাইল ফ্যাশন। কারখানা কর্তৃপক্ষের নোটিশে অভিযোগ করা হয়, কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সাধারণ শ্রমিকদের উসকে দিয়ে কাজ বন্ধ করে এবং জোরপূর্বক কর্মস্থল ত্যাগ করে বাইরে চলে যায়। নিয়মিত কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও শ্রমিকরা কর্মস্থলে না ফেরায় শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখা হয়। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর কারখানাগুলো পুনরায় পুরোদমে চালু হয়েছে বলে মালিক সংগঠন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে শফিকুল ইসলাম নামের এক বিক্ষোভকারী পোশাক শ্রমিক বলেন, বর্তমান বাজারে যে বেতন তারা পাচ্ছেন তা দিয়ে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেক শ্রমিক রিমন জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠ ছাড়বেন না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান সংকটে হঠাৎ করে মূল বেতন বড় অঙ্কে বাড়িয়ে দিলে কারখানার উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ধাক্কা সামলে নিতে পারলেও মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের সামর্থ্য বিবেচনা করে একটি টেকসই ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন।
তৈরি পোশাক খাতের এই চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বক্তব্য দিয়েছে।
ঘটনায় পতিত আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী চক্র এই আন্দোলনে অর্থ জোগান দিচ্ছে। সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ পাঠানো হচ্ছে এবং দেশের ভেতরে থাকা কিছু রাজনৈতিক শক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া গোয়েন্দা কাঠামোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিরোধী দলের ওপর অযথা দায় চাপানো হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপরে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় শ্রমিকরা গভীর কষ্টে আছেন। বিরোধী দলকে দোষারোপ না করে মালিকপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে অবিলম্বে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়াই সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন