অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১০:১৫ এএম
সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের আকাশে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। শনিবার (২৪ অক্টোবর) পরিচালিত এই অভিযানের পর ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ মক্কা ও মদিনার বেশ কয়েকটি স্থানে আছড়ে পড়ে বলে নিশ্চিত করেছে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। তবে পবিত্র দুই নগরীকে লক্ষ্য করে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। পাল্টাপাল্টি এই দাবি ও হামলার জেরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে নিরাপত্তা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো বিভিন্ন স্থানে আছড়ে পড়লেও এতে কোনো ব্যক্তি হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি রিয়াদ।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হুতি মিলিশিয়াদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝআকাশে ধ্বংস করা হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই ক্ষেপণাস্ত্র দুটির অবশিষ্টাংশ মক্কা আল-মুকাররামা ও মদিনা আল-মুনাওয়ারা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পড়েছে।
বিবৃতিতে সুনির্দিষ্ট এলাকার বিবরণ দিয়ে বলা হয়, ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ মক্কার প্রান্তবর্তী ওয়াদি মুগামাস, জেদ্দার আল-নুজহা এলাকা, তায়েফের ওয়াদি জলিল এবং রাবিঘের একটি জনবসতিহীন প্রান্তরে আছড়ে পড়েছে।
পবিত্র দুই নগরীতে আঘাত হানার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে হুতিরা।
সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি কর্তৃপক্ষের এই দাবিকে পুরোপুরি অসত্য আখ্যা দিয়ে বলেন, পবিত্র ভূমি মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে সৌদি শত্রুপক্ষ যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এক ভয়াবহ মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়।
আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের এই ঘটনার আগে শনিবার দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত চারটি প্রদেশে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে বিশেষ জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল মক্কা প্রদেশও। দুর্যোগপূর্ণ সেই সতর্কবার্তায় সম্ভাব্য বিপদের কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এই বিশেষ সংস্থাটি জরুরি পরিস্থিতি ও দুর্যোগকালীন সময় বেসামরিক নাগরিক ও তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে থাকে।
জরুরি সতর্কবার্তা জারির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই হুতিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা শুক্র ও শনিবার টানা দুই দিন ধরে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে একাধিক সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল তিনটি বিমানবন্দর, দুটি তেল শোধনাগার বা স্থাপনা, একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন এবং একটি প্রধান বিমানঘাঁটি।
হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বিস্তারিত দাবি করে জানান, সৌদি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই দফায় সফল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তাদের যোদ্ধারা। রাজধানী ছাড়াও দাম্মাম এবং সীমান্তবর্তী নাজরান অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোতেও সরাসরি নিশানা করা হয়েছিল।
এর পাশাপাশি হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানার দাবি করেছে। একই সঙ্গে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিমাঞ্চলের লোহিত সাগর উপকূলে তেল সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত মূল পাইপলাইন এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পাম্প করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাম্পিং স্টেশনেও ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছে বলে তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
সীমান্তপারের এই সংঘাতের আঁচ লেগেছে ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও। শনিবার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে তাদের কোস্টগার্ড বা উপকূলরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে হুতি বিদ্রোহীরা।
নতুন করে এই সামরিক সংঘাতের ফলে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ওই ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতির কারণে বিগত বছরগুলোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এবং হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে পরস্পরকে নিশানা করে আক্রমণ চালানোর ঘটনা বহুলাংশে বন্ধ ছিল।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামরিক জোট। বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখনো নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন