অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১০:০২ এএম
সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে ও পারস্পরিক ভালোবাসা বাড়াতে উপহার আদান-প্রদানকে ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি আচার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার ক্ষোভ, মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও শত্রুতা দূর হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নে উপহার বিনিময়ের তাগিদ দিয়েছেন। সুনান আত তিরমিজির ২১৩০ নম্বর ও সহিহ বুখারির ২৩৯৬ নম্বর হাদিসে এসেছে, নবীজি নির্দেশ দিয়েছেন তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, কারণ উপহার অন্তরের বিদ্বেষ দূর করে; এমনকি কোনো নারী প্রতিবেশী যদি অপর নারী প্রতিবেশীকে ছাগলের পায়ের সামান্য একটি ক্ষুরও উপহার হিসেবে পাঠায়, তবুও যেন তা তুচ্ছজ্ঞান বা অবহেলা না করা হয়।
স্বয়ং রাসুলুল্লাহ নিজেও উপহার গ্রহণ করতেন এবং প্রতিদানে অন্যকেও উপহার দিতেন। সহিহ বুখারির ২৪১৪ নম্বর হাদিসে আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপহার বা হাদিয়া কবুল করতেন এবং যথাসাধ্য তার উত্তম প্রতিদান প্রদান করতেন।
তবে উপহারের এই অবকাশ অবাধ ও শর্তহীন নয়।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী উপহারের ক্ষেত্রে হালাল, হারাম ও ন্যায়বিচারের কঠোর রূপরেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের উপহার লেনদেন যেমন শরিয়তে বৈধ নয়, তেমনি কোনো দায়িত্ব, সুদ, ঘুষ বা অবিচারের বাহন হিসেবে দেওয়া উপহার গ্রহণকে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিসের আলোকে নিচে ইসলামে নিষিদ্ধ এমন চারটি সুনির্দিষ্ট উপহারের ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করা হলো।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় বা সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় উপহার গ্রহণ করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজস্ব আদায়কারী বা রাষ্ট্রীয় কর্মচারী সাধারণ জনগণের কাছ থেকে উপহার নিলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে ঘুষের সমতুল্য অপরাধ। সুনান আত তিরমিজির ১৩৩৭ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষ গ্রহণকারী এবং ঘুষ প্রদানকারী উভয় ব্যক্তির ওপরই অভিসম্পাত করেছেন।
দায়িত্বের কারণে পাওয়া উপঢৌকনকে হাদিয়া বলার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
সহিহ বুখারির ২৪২৫ নম্বর হাদিসে আবু হুমায়দ সাঈদী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি আযদ গোত্রের ইবনু উতবিয়া নামের এক ব্যক্তিকে সাদকা বা জাকাত আদায়ের সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে এসে তিনি কিছু সম্পদ দেখিয়ে দাবি করেন, এগুলো রাষ্ট্রীয় সাদকার মাল এবং বাকি অংশ ব্যক্তিগতভাবে তাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, সে তার বাবার ঘরে কিংবা মায়ের ঘরে কেন বসে থাকল না, তখন সে দেখত তাকে কেউ উপহার দেয় কি না?
নবীজি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেন, যে সত্তার হাতে তাঁর প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছেন, সাদকার মাল থেকে যে ব্যক্তি সামান্য পরিমাণও আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সে তা কাঁধে বহন করে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য হবে। আত্মসাৎকৃত মাল যদি উট হয় তবে তা চিৎকার করতে থাকবে, গাভী হলে ডাক ছাড়তে থাকবে এবং ছাগল হলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ শব্দ করতে থাকবে। এরপর নবীজি নিজের দুই হাত এতটা উঁচু করলেন যে তাঁর বগলের শুভ্রতা দৃশ্যমান হলো এবং তিনি উপস্থিত সাহাবিদের লক্ষ্য করে বারবার বললেন, হে আল্লাহ, আমি কি আপনার বিধান পৌঁছে দিয়েছি?
দ্বিতীয়ত, কারও চাকরি বা কোনো কাজের সুপারিশের বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। কোনো অসহায় বা অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির বিপদ দূর করা কিংবা বৈধ উপায়ে তাকে কাজের সুযোগ করে দিতে সহযোগিতা করা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এই উপকারের প্রতিদান হিসেবে কোনো উপহার নিলে তা আর্থিক অপরাধের শামিল হয়।
সুনান আবু দাউদের ৩৫৪১ নম্বর হাদিসে আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের জন্য কোনো বিষয়ে সুপারিশ করে এবং সেই সুপারিশের কারণে উপকৃত ব্যক্তি তাকে কোনো উপহার দেয় আর সে তা গ্রহণ করে, তবে সে সুদের একটি বড় তোরণ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
অর্থাৎ ইসলামে অন্যের কল্যাণে মধ্যস্থতা বা সুপারিশ করতে হবে সম্পূর্ণরূপে নিঃস্বার্থ মনোভাব নিয়ে। কোনো সেবার পর উপহার নেওয়াকে পরোক্ষ সুদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে পুরোপুরি হারাম করেছেন।
তৃতীয়ত, ঋণের বিপরীতে কোনো প্রকার উপহার বা বাড়তি সুবিধা নেওয়া নিষিদ্ধ। অভাবের সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে করজ বা ঋণ দেওয়া সওয়াবের কাজ। কিন্তু ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে মূল অর্থের অতিরিক্ত কোনো হাদিয়া বা উপঢৌকন দাবি বা গ্রহণ করলে তা রিবা বা সুদের আওতায় পড়ে যায়।
সহিহ বুখারির ৩৫৪২ নম্বর হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, বিশিষ্ট তাবেয়ি আবু বুরদা রাহিমাহুল্লাহ মদিনায় গেলে প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। কুশল বিনিময়ের পর সাহাবি তাঁকে তৎকালীন ইরাকের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তুমি এমন এক এলাকায় বাস করো যেখানে সুদের বিস্তার অত্যন্ত ব্যাপক; সুতরাং কারও কাছে যদি তোমার কোনো ঋণ বা পাওনা থাকে এবং সেই ব্যক্তি যদি তোমাকে এক আঁটি ঘাস, খড় বা অত্যন্ত নগণ্য কোনো বস্তুও উপহার হিসেবে দেয়, তবুও তুমি তা গ্রহণ করবে না, কারণ তা সুদের অন্তর্ভুক্ত।
একই প্রসঙ্গে সুনান ইবনু মাজাহর ২৪৩২ নম্বর হাদিসে ইয়াহইয়া ইবনে আবু ইসহাক আল-হানাঈ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি বলেছেন, তোমাদের কেউ কাউকে ঋণ দেওয়ার পর ঋণগ্রহীতা যদি তাকে কোনো উপহার দেয় কিংবা নিজের বাহনে চড়াতে চায়, তবে সে যেন উপহার না নেয় এবং বাহনেও না চড়ে। তবে ঋণ আদান-প্রদানের আগে থেকেই যদি তাদের মধ্যে স্বাভাবিক উপহার বা সৌজন্য বিনিময়ের পারিবারিক অভ্যাস চালু থেকে থাকে, তবে সেক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।
চতুর্থত, সন্তানদের মধ্যে কাউকে বঞ্চিত করে কিংবা বৈষম্যমূলকভাবে অতিরিক্ত উপহার দেওয়া নিষিদ্ধ। সন্তানদের পার্থিব উপহার দেওয়ার পাশাপাশি আদর্শ শিষ্টাচার ও নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলাকে ইসলামে শ্রেষ্ঠ উপহার গণ্য করা হয়েছে। সুনান আত তিরমিজির ১৯৫২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো উপহার দিতে পারে না।
সন্তানদের বৈষয়িক সম্পদ দানের ক্ষেত্রে মাতা-পিতাকে পূর্ণ ইনসাফ রক্ষা করতে হবে। সংগত কারণ ছাড়া এক সন্তানকে দামি উপহার দেওয়া এবং অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা গুরুতর অবিচার।
সহিহ বুখারির ২৪১৬ নম্বর হাদিসে আমির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নুমান ইবনু বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে বিশেষ কিছু সম্পত্তি দান করেছিলেন। তখন তাঁর মা আমরা বিনত রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহা শর্ত দেন যে আল্লাহর রাসুলকে সাক্ষী রাখা ছাড়া তিনি এই দানে একমত হবেন না। বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে পুরো বিষয়টি জানিয়ে তাঁকে সাক্ষী থাকার আরজ জানান। তখন নবীজি জানতে চাইলেন, তুমি কি তোমার সব সন্তানকেই সমানভাবে এমন দান করেছ? উত্তরে তিনি ‘না’ সূচক জবাব দিলে রাসুলুল্লাহ নির্দেশ দিলেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো। নবীর এই সুস্পষ্ট নির্দেশের পর বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘরে ফিরে এসে সেই দান প্রত্যাহার করে নেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন