অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১০:৪১ এএম
পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার বাদী মানিক পশারীর দাফন দিনভর চরম উত্তেজনার পর প্রশাসনের উপস্থিতিতে গভীর রাতে সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত প্রায় একটার দিকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে তাকে কবরস্থ করা হয়। এর আগে দিনভর স্থানীয় জামায়াত নেতা-কর্মী ও একদল বিক্ষুব্ধ জনতার বাধার মুখে তার গার্ড অব অনার ও দাফন প্রক্রিয়া দফায় দফায় বাধাগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে তার জন্য খোঁড়া কবর মাটি ফেলে ভরাট করে দেওয়া হয়। পরে পুরুষ মানুষ না পাওয়ায় তার বোন ও দুই মেয়ে মিলে নতুন করে কবর খনন করতে বাধ্য হন। স্থানীয়ভাবে তার কোনো জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানা গেছে।
লাশ দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান নিয়ে দিনভর পিরোজপুরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে।
জামায়াত নেতাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এবং এ কারণে তাকে কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শনিবার দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতের বাঁধার কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। এর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর পিরোজপুর পুলিশ লাইনের ভেতরে তাকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মানিক পশারীর মরদেহ তার নিজ গ্রাম চিথলিয়াতে দাফন করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে এলাকার কিছু লোক বিক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং খোঁড়া কবরটি মাটি চাপা দেন। শনিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে পাড়েরহাট বন্দর এলাকায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে নাসিম সাঈদীর নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানে প্রায় দুই মাস ধরে বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে শনিবার সকাল দশটার দিকে তিনি মারা যান। দুপুর বারোটার দিকে তার মরদেহ গার্ড অব অনারের জন্য পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদে নিয়ে আসা হলে জামায়াত নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। পরে পুলিশি পাহারায় মরদেহ পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও বাইরে বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী অবস্থান নেন।
পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানান, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরহুম মানিক পশারীকে পুলিশ লাইন্সে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে শনিবার দিবাগত রাত একটার দিকে প্রশাসনের সরাসরি উপস্থিতিতে পুলিশ প্রহরায় তাকে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন ও মির্জা জহুরুল হক দাবি করেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না এবং মানিক পশারীও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর মানিক পশারীকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছিল।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তার দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেই দলীয় নেতা-কর্মী ও স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেন, মানিক পশারী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় নিজেই স্পষ্ট করেছিলেন যে তিনি সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। তিনি অভিযোগ করেন, আত্মগোপনে থাকা পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজানোর পর মানিক পশারীকে সুপারিশপত্র দিয়ে সরকারি গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার নাম লিখিয়েছিলেন।
মাসুদ সাঈদী আরও উল্লেখ করেন, সরকারি গেজেটে যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে, সেহেতু প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আপত্তি নেই, কারণ সরকার কেবল তার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে চিথলিয়া গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে সেখানে দাফন প্রতিহত করেছে এবং কবর ভরাট করে দিয়েছে।
মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেন অভিযোগ করেন, সকাল দশটায় মৃত্যুর পর দুপুর বারোটায় তারা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো ধরনের বরফ বা চা-পাতা ছাড়াই সাধারণ একটি অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা হয়েছিল এবং পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত পুলিশ লাইন্সের ভেতরে তাকে অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন