রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬,

প্রেমাদা ওরালি সিনেমার ইতিহাস: চার সপ্তাহে শতকোটি রুপি আয়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

প্রেমাদা ওরালি সিনেমার ইতিহাস: চার সপ্তাহে শতকোটি রুপি আয়

ছবি: সংগৃহীত

মাত্র তিন কোটি রুপির কম ব্যয়ে নির্মিত স্বল্প বাজেটের কন্নড় সিনেমা ‘প্রেমাদা ওরালি’ ভারতের বক্স অফিসে নজিরবিহীন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির মাত্র ২৮ দিনের মাথায় ভারতীয় বাজারেই ছবিটির টিকিট বিক্রির মোট আয় ১০০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে গেছে। বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত মন্থর গতিতে শুরু হলেও সাধারণ দর্শকের মুখে মুখে ইতিবাচক প্রচার এবং সাড়াজাগানো প্রশংসার জোরে সিনেমাটি এখন ভারতীয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে ব্লকবাস্টারের গৌরব অর্জন করেছে।

আন্তর্জাতিক বিনোদন বাণিজ্য ও বক্স অফিসের খতিয়ান প্রকাশকারী পোর্টাল পিঙ্কভিলার তথ্য বলছে, মুক্তির চতুর্থ সপ্তাহ শেষে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে সিনেমাটির সমন্বিত আয় দাঁড়িয়েছে ১০১ কোটি ৫০ লাখ রুপিতে। কেবল চতুর্থ সপ্তাহেই সিনেমাটির টিকিট বিক্রি থেকে এসেছে ২৮ কোটি ৫০ লাখ রুপি। উৎসবের আমেজ ও ছুটির দিন থাকায় চতুর্থ সপ্তাহের এই বাণিজ্যিক প্রবাহ ছবিটির দ্বিতীয় সপ্তাহের বিশাল আয়ের প্রায় কাছাকাছি অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।

মুক্তির প্রথম দিনে প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির টিকিট বিক্রি ছিল মাত্র ১০ লাখ রুপিরও নিচে।

সেখান থেকে মাত্র চার সপ্তাহের ব্যবধানে শতকোটির অভিজাত ক্লাবে নাম লেখানোকে কন্নড় চলচ্চিত্র বাণিজ্যের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে দেখছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা।

ভারতের মোট আয়ের সিংহভাগ এসেছে নিজ রাজ্য কর্ণাটক থেকে। প্রথম ২৮ দিন শেষে কেবল কর্ণাটক থেকেই ছবিটির ঝুলিতে জমা হয়েছে প্রায় ৯৯ কোটি ৭৫ লাখ রুপি। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পঞ্চম সপ্তাহের শুরুতেই কর্ণাটকে ছবিটির আয় এককভাবে ১০০ কোটি রুপি স্পর্শ করবে। বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে যে হারে দর্শকের ভিড় রয়েছে, তাতে ভারতে ছবিটির মোট আয় ১২৫ কোটি রুপিতে পৌঁছানোর জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে কর্ণাটকে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী কন্নড় চলচ্চিত্রের তালিকায় চার নম্বরে স্থান করে নেবে ‘প্রেমাদা ওরালি’। এই তালিকার শীর্ষ তিনটি স্থানে অবস্থান করছে ‘কান্তারা চ্যাপ্টার ১’, ‘কান্তারা’ এবং ‘কেজিএফ চ্যাপ্টার ২’। অন্যদিকে কন্নড় গণমাধ্যম নিউজ কর্ণাটকের একটি খতিয়ানে উঠে এসেছে, মুক্তির ২৯ দিন শেষে বিশ্বব্যাপী এই চলচ্চিত্রের সামগ্রিক আয় ১১৪ কোটি রুপি অতিক্রম করেছে।

সিনেমাটির সপ্তাহভিত্তিক বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতের বাজারে মুক্তির প্রথম সপ্তাহে ছবিটি আয় করেছিল মাত্র ৬ কোটি ২৫ লাখ রুপি। দ্বিতীয় সপ্তাহে নাটকীয়ভাবে লাফিয়ে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৭৫ লাখ রুপিতে এবং তৃতীয় সপ্তাহে আরও বেড়ে আসে ৩৯ কোটি রুপি। চতুর্থ সপ্তাহেও সিনেমাটি ধারাবাহিক গতি ধরে রাখে। মুক্তির ২২তম দিন থেকে ২৯তম দিন পর্যন্ত আট দিনে মোট আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৫০ লাখ রুপি, যেখানে দৈনিক গড় বিক্রি ছিল প্রায় ৩ কোটি ৮১ লাখ রুপি। তবে ২৯তম দিনে এসে দৈনিক টিকিট বিক্রি কমে আনুমানিক ২ কোটি রুপিতে নামে।

চমকপ্রদ এই আর্থিক সাফল্যের পেছনে নির্মাতাদের সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত কঠিন। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের মাঝপথে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েন পরিচালক মনোজ কুমার। অবস্থা এমন জটিল রূপ ধারণ করেছিল যে কাজ সচল রাখতে নিজের ব্যক্তিগত মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রাখার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। বড় বাজেটের ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোর মতো গণমাধ্যমে বিশাল বিজ্ঞাপনী প্রচারণা চালানোর আর্থিক সংগতি প্রযোজকদের ছিল না। ফলে একেবারে বিকল্প ও প্রান্তিক জনসংযোগের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন নির্মাতারা।

ছবির অভিনয়শিল্পী এবং পুরো নির্মাণ দলের সদস্যরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে নিজেরাই সরাসরি শহরের রাজপথে নেমে আসেন।

তারা পথচারীদের হাতে প্রচারপত্র ও বিশেষ আমন্ত্রণপত্র বিলি করতে থাকেন। এমনকি গণপরিবহনের সাধারণ লোকাল বাসে উঠে যাত্রীদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলে সিনেমাটি একবার দেখার অনুরোধ জানান। সাধারণ দর্শকের আবেগকে স্পর্শ করা এই নিবিড় চেষ্টার পরই সিনেমাটির কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে পুরো ভারতে এই ছবির প্রদর্শনী ছিল মাত্র ৬০টি, যা পরে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

গ্রামীণ সমাজবাস্তবতা, নিখাদ প্রেম, পারিবারিক টানাপোড়েন, দাম্পত্যের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং নারীর সংবেদনশীল অনুভূতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘প্রেমাদা ওরালি’র মূল গল্প। এতে নাগান্না নামের এক সাধারণ কৃষক ও তার সন্তান শান্তুর জীবনসংগ্রাম দৃশ্যমান হয়েছে। স্ত্রীর অকালমৃত্যুর পর নাগান্না গভীর মমতায় সন্তানকে একা বড় করে তোলেন এবং ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সুশিক্ষিত একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু শান্তুর প্রতি তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বসন্তার একধরনের দুর্বলতা থাকে। শেষমেশ বাবার পছন্দ অনুযায়ী রুক্মিণীকে বিয়ে করার পর শান্তুর পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে তৈরি হয় গভীর সংকট ও জটিলতা।

পরিচালক মনোজ কুমারের এই সৃষ্টিতে নাগান্না চরিত্রে শক্তিশালী অভিনয় করেছেন প্রবীণ অভিনেতা রঙ্গায়না রঘু, শান্তু চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রী রাম, রুক্মিণীর ভূমিকায় তাপস্বিনী পুনাচ্চা এবং বসন্তা চরিত্রে রূপদান করেছেন রামিকা শিবু।

স্বল্প বাজেটের এই সিনেমার অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্য ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষ তারকাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কন্নড় সুপারস্টার যশ এবং ‘কান্তারা’খ্যাত তারকা ও নির্মাতা ঋষভ শেঠি খোলাখুলিভাবে এমন গল্পভিত্তিক কাজের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সাধারণ সিনেমা দর্শকদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সম্প্রতি বহুল আলোচিত বিগ বাজেটের সিনেমা ‘টক্সিক’-এর বাণিজ্যিক ব্যর্থতার পর এই ছোট ছবির এমন জয়জয়কার চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন নজির স্থাপন করেছে।

একই সঙ্গে কর্ণাটকে চলতি ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার খেতাব জয়ের দৌড়েও এগিয়ে রয়েছে এটি। এর মাধ্যমে রণবীর সিংয়ের ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ সিনেমার আয়কেও পেছনে ফেলার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে নিউজ কর্ণাটকের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে আসা ১১৪ কোটি রুপির অংকটি হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহের মোট আয় বা গ্রস কালেকশন; এটি প্রযোজক বা নির্মাতাদের চূড়ান্ত লাভ নয়। প্রেক্ষাগৃহের প্রদর্শন ভাড়া, সরকারি কর ও পরিবেশনা সংস্থার কমিশন বাদ দিলে নির্মাতাদের ঘরে আসা নিট মুনাফার পরিমাণ কিছুটা পরিবর্তিত হবে। তবুও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা ও সীমিত প্রচারের বাধা পেরিয়ে এই জয়যাত্রা কন্নড় কনটেন্টের আন্তর্জাতিক শক্তিমত্তার নতুন দৃষ্টান্ত।