রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬,

বিক্ষোভে উত্তাল ইতালি: মিলানে সেনা টহল ও রোমে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

বিক্ষোভে উত্তাল ইতালি: মিলানে সেনা টহল ও রোমে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বন্ধ, যুদ্ধবিরোধী নীতি গ্রহণ, পেনশন সুরক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান আবাসনসংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষের তীব্র বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইতালি। রাজধানী রোম, মিলান ও তুরিনসহ দেশটির প্রধান প্রধান শিল্পনগরীগুলোতে শনিবার ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক রাজধানী মিলানে গত সপ্তাহের সহিংস সংঘর্ষ ও দোকানপাটে লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ ও বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার।

শনিবারের এই বিক্ষোভ চলাকালে মিলানের পরিস্থিতি কড়া নজরদারির মধ্যে আপাত শান্ত থাকলেও রোম ও তুরিন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

একই দিনে ইউরোপের আরও কয়েকটি প্রধান দেশের রাজধানীতেও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা দাবিতে সমান্তরাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

মিলানের রাজপথে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অতিরিক্ত ৫০০ সেনা সদস্য মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এর আগে থেকেই শহরটির স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে কয়েকশ সামরিক সদস্য দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। নতুন এই সেনা সংযুক্তির ফলে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সরাসরি মাঠে নামানো হয়। নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে আকাশে ড্রোন উড়িয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, প্রধান প্রধান রেলস্টেশনে তল্লাশি চৌকি স্থাপন, পুলিশের বিশেষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল প্রস্তুত রাখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘাতের সম্ভাব্য উসকানি নজরে রাখতে বিশেষ সাইবার নজরদারি চালু করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী মেলোনি জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের সংঘাত ও অরাজকতার পেছনে অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের বড় অংশের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে শহরের বিলাসবহুল ফ্যাশন এলাকায় ওমেগা, টিফানি ও গুচির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের আউটলেটগুলোর সামনের কাচের অংশ বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে সুরক্ষিত রাখা হয়।

বিলাসবহুল অ্যাপল স্টোর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও বিকেলের দিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অধিকাংশ দোকানপাট পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। গত সপ্তাহান্তে মিলানের ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় দুওমো চত্বরের পার্শ্ববর্তী রাস্তাগুলোতে একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক কয়েকটি দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবার নিরাপত্তা বলয় কেবল মূল শহরের কেন্দ্রস্থলে সীমাবদ্ধ না রেখে দূরবর্তী প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও সম্প্রসারিত করা হয়, যাতে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও সার্বিক পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। শনিবার সন্ধ্যার দিকে মিলান পলিটেকনিকের সামনে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি শেষ করেন।

ইতালির শহরগুলোতে চলা এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একগুচ্ছ মৌলিক নাগরিক সংকট। আন্দোলনকারীরা শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, প্রশাসনিক দুর্নীতি প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান, সামাজিক পেনশন ব্যবস্থার নিরাপত্তা বিধান এবং নিম্নবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিতের দাবি তুলেছেন।

পুলিশ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে মিলানের সড়ক সহিংসতায় প্রায় দুই হাজার তরুণ অংশ নেয়, যাদের একটি বড় অংশই ছিল স্কুলগামী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক।

ওই সহিংসতার জেরে টানা দুই দিনের অভিযানে পুলিশ ৪৫ জনকে আটক করে, যার মধ্যে ৩৪ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়। এদিকে শনিবারের আন্দোলনের পেছনে ইন্ধনদাতা হিসেবে সদ্য গঠিত ‘অক্টোবর ১৭’ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৩০ বছর বয়সী এক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। পুলিশের সন্দেহ, তিনিই এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান নেপথ্য পরিকল্পনাকারী।

রাজধানী রোমেও বিলাসবহুল বাণিজ্যিক সড়ক এবং সার্কাস ম্যাক্সিমাস ও পিয়াজা দেল পোপোলোর আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশি পাহারা বসানো হয়। এর মধ্যে একদল বিক্ষোভকারী কলোসিয়ামে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালালে নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত তাদের প্রতিহত করে বের করে দেন। তবে কয়েকশ শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তারা কোনো ধরনের সহিংস তৎপরতার সাথে যুক্ত নন। এর বাইরে রোমে অনুষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র যুদ্ধবিরোধী মিছিলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বেধে যায়, যেখানে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান নিক্ষেপ করলে আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হন।

ইতালির পাশাপাশি বলকান অঞ্চলের দেশ আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সহিংস রূপ ধারণ করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। সেখানে একদল আন্দোলনকারী কয়েকটি সরকারি প্রশাসনিক ভবনে অগ্নিসংযোগ করেন এবং ব্যারিকেড ভেঙে পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিরানার রাস্তায় আড়াই হাজার অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আলবেনিয়ার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার ফি হ্রাস, শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের একটি বড় অংশ প্রধানমন্ত্রী এদি রামার অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী রামা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে টেবিলে বসে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি সহিংসতায় যুক্তদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

ইউরোপের অন্যান্য অংশেও অসন্তোষের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পেনশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও বেসরকারীকরণের আশঙ্কায় হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ ও নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে পদযাত্রা করেছেন। আগামী মাসে স্পেনে আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে, যার মুখে পেনশন সংস্কার নিয়ে ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল ও বিরোধী রক্ষণশীলদের মধ্যে বাগযুদ্ধ তুঙ্গে উঠেছে। এর পাশাপাশি বাড়িভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশটিতে আবাসনসংকট নিয়ে টানা আন্দোলন চলছে।

একই দিনে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিশাল নাগরিক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির সরকার প্রস্তাবিত বার্ষিক বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সীমা প্রত্যাহার এবং বকেয়া ভাড়ার কারণে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সহজ করার বিতর্কিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। যদিও পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো দাবি করেছেন যে এসব আইনি সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের পারস্পরিক বিশ্বাস ফিরিয়ে এনে আবাসন বাজারকে গতিশীল করা, তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই নতুন আইনের ফলে সাধারণ ভাড়াটিয়ারা মারাত্মক সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়বেন।