অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আধুনিক রণকৌশল, ড্রোন আক্রমণ এবং বিমান হামলার মারাত্মক হুমকি কার্যকরভাবে মোকাবিলায় ৬০ হাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার এক নজিরবিহীন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারত সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের প্রথম ধাপে দেশটির সীমান্তবর্তী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এই কর্মসূচিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চেয়ে আধুনিক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো পাহারা এবং পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জরুরি উদ্ধার তৎপরতার ওপর মূল নজর দেওয়া হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেসামরিক প্রতিরক্ষা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করার সুস্পষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এরপরই শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমন্বিত প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রথম ধাপে অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলোর তালিকায় রয়েছে জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাট, দিল্লি, মেঘালয়, সিকিম, আসাম, উত্তর প্রদেশ, কেরালা, কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ু।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্ধারিত বিশেষ প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে প্রথমে ৬০০ জন বাছাইকৃত প্রশিক্ষককে নিবিড় সামরিক পাঠ দেওয়া হবে।
এই প্রশিক্ষকরা ‘সিভিল ডিফেন্স মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে পরিচিত হবেন। তিন দিনের বিশেষ কর্মশালা শেষে এই প্রশিক্ষকদের প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে আরও ১০০ জন করে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবককে সরাসরি প্রশিক্ষণ দেবেন। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্যোগকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের পরিচালনাগত অভিজ্ঞতা এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ প্রস্তুতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, প্রকল্পটিতে প্রচলিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার কোনো নির্দেশনা রাখা হয়নি। এর মূল লক্ষ্য পুরোপুরি যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা এবং হাইব্রিড যুদ্ধের মতো জটিল সংঘাত ব্যবস্থাপনা।
ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে ৫০ জন করে প্রতিনিধিকে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে হুমকি সম্পর্কে সচেতনতা, সুরক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামরিক সমন্বয়।
সরকারি রূপরেখায় সম্ভাব্য হুমকির তালিকায় আধুনিক ও হাইব্রিড যুদ্ধ, শত্রু ড্রোনের নজরদারি ও হামলা এবং সরাসরি বিমান আঘাতের বিষয়গুলোকে সর্বাগ্রে রাখা হয়েছে। এছাড়া জরুরি উদ্ধার অভিযান, রাসায়নিক, জীবাণু, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক বা সিবিআরএন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনির্বাপণ এবং যুদ্ধাহত নাগরিকদের প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর স্বেচ্ছাসেবকদের তৈরি করা হবে। সমাপনী পর্বে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক কমান্ড পরিচালনার বাস্তবমুখী কৌশল শেখানো হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্ল্যাকআউট বা অন্ধকার মহড়া আয়োজন করেছিল নয়াদিল্লি। জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে একটি সন্ত্রাসী ঘটনার পর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে স্থানীয় নাগরিকদের রাতের বেলা আলো বন্ধ করে ঘরের ভেতর অবস্থানের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই মহড়ায় ওয়ার্ডেন, হোম গার্ড, এনসিসি ও যুব সংগঠনের পাশাপাশি স্কুল ও কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়।
চলতি বছরের গ্রীষ্মেও বিহারের পাটনা, কিশনগঞ্জ ও কাটিহারসহ ছয়টি জেলায় এ ধরনের বিদ্যুতহীন ব্ল্যাকআউট মহড়া বাস্তবায়ন করে স্থানীয় প্রশাসন।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের এই প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর শান্তিকালীন সময়ে এ ধরনের নাগরিক ব্ল্যাকআউট মহড়ার কোনো নজির নেই। এ অঞ্চলে বেসামরিক প্রতিরক্ষার মূল কাজ যুদ্ধ নয়, বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেসামরিক প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা। নেপালেও বেসামরিক ও সামরিক সমন্বয় পুরোপুরি ভূমিকম্প বা বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একইভাবে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাতেও বিমান হামলা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে সাধারণ নাগরিকদের কোনো সামরিক মহড়ায় সম্পৃক্ত করার চল নেই।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন