অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন সামরিক হামলার পাল্টা জবাব দিতে সম্পূর্ণ রণপ্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। পারস্য উপসাগরের জলসীমায় কিংবা আশপাশের এলাকায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করলেই সরাসরি বিধ্বংসী আঘাত হানা হবে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর পথ বিবেচনা করছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
শুক্রবার ফ্লোরিডায় আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারও ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান পরিচালনা করতে পারে। চলমান সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানে পরিচালিত ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সামরিক সাংকেতিক নাম ছিল ‘এপিক ফিউরি’। এর আগে সংঘাত দ্রুত সমাপ্ত করতে ইরানে বড় ধরনের হামলা অথবা টানা অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির বিকল্প নিয়ে ভাবছিলেন তিনি।
শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদোল্লাহি সাফ জানিয়ে দেন, মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষে ইরানের জলসীমায় বা এর কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া আর সম্ভব হবে না। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে নিখুঁত আঘাত হানার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলি আবদোল্লাহি মন্তব্য করেন, পারস্য উপসাগরে নিজেদের সৈন্য ও রণতরী পুনরায় মোতায়েনের স্বপ্ন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য অধরাই থেকে যাবে এবং তাদের এই অভিলাষ চিরতরে কবরে চলে যাবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ওয়াশিংটন যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তার সঙ্গে যুদ্ধজাহাজগুলোকে ইরানি জলসীমার বাইরে দূরে রাখার মার্কিন সিদ্ধান্তের কোনো মিল নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে সূচিত যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আসছে তেহরান। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি করে শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন ইরানি নীতিনির্ধারকরা।
এদিকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর তেহরানের হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ ডলারে পৌঁছায়, যা গত এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরের আগেই অন্তত সাতটি তেলের ট্যাংকারে আক্রমণ করা হয়েছে কিংবা সেগুলো পেতে রাখা মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর শুক্রবার আরও দুটি সুপারট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে বাহিনীটি জানায়, তাদের বর্তমান কৌশল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে সৌদি আরবে দায়িত্বরত বহু কূটনীতিক ও দূতাবাসকর্মীকে অবিলম্বে সেদেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মিশন থেকেও মার্কিন কর্মকর্তা সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলের একাধিক ফ্রন্টে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের ভেতরে একের পর এক রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। শনিবার রাজধানী রিয়াদে আঘাত হানার আগে তারা দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করেও হামলা চালায়। জবাবে ইয়েমেনের মারিব, তাইজসহ হুথি-নিয়ন্ত্রিত অবস্থানগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বিমানবাহিনী।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও নাবাতিয়েহর কাছে বিমান হামলা এবং জাওতার আশ-শারকিয়াহ এলাকায় কামানের গোলাবর্ষণ করেছে ইসরাইলি সেনারা। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যে কোনো যুদ্ধবিরতি আলোচনায় লেবানন ফ্রন্টকেও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে স্থানীয়দের হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে পুরো এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ জারির নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন এবং ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে, যার রাজনৈতিক প্রভাব সংঘাতের গতিপ্রকৃতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে।
গাজা ও পশ্চিম তীরের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরাইলের ভূখণ্ডেও সরাসরি হামলা অব্যাহত রেখেছে হুথিরা।
তেহরানের ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেতানিয়াহু পুনরায় ব্যক্ত করার পর ইরান ‘ডেড হ্যান্ড’ নামের বিশেষ কৌশলগত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করেছে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। এই পরিকল্পনার আওতায় শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ এলে ইরানের ৩১টি প্রদেশ থেকেই একযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আঞ্চলিক স্বার্থে স্বয়ংক্রিয় ও সমন্বিত পাল্টা আঘাত হানা হবে।
আইআরজিসি হুঁশিয়ার করেছে, সামরিক পদক্ষেপ বেসামরিক অবকাঠামো পর্যন্ত গড়ালে সমুদ্রতলের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ও যোগাযোগ কেবলগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এছাড়া শনিবার মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের নিশানা করতে ইরান নিজেদের প্রস্তুতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।
সংকট সমাধানে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অংশগ্রহণে এক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে ওয়াশিংটন বা তেহরানের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। বৈঠকে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নতুন সামরিক আগ্রাসনকে পুরো অঞ্চলের জন্য সর্বনাশা আখ্যা দিলেও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি ইরান ও হুথিদের অভিযুক্ত করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া চারটি আঞ্চলিক দেশ ইসরাইলি দখলদারত্বকে মূল সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে হরমুজ প্রণালিতে স্বাধীন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানায় এবং বাণিজ্যিক নৌযানে হামলা ও সৌদি আরবের স্বার্থে হুথিদের আঘাতের নিন্দা জানায়। তবে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নূর নিউজ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তেহরানের দাবি মেনে নেওয়া এবং হামলাগুলোর আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করতে কোনো ছাড় দেবে না ইরান।
ইরানি গণমাধ্যমগুলোও রণপ্রস্তুতিকে সামনে এনে তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধিকে প্রতিপক্ষের জন্য স্পষ্ট সংকেত হিসেবে তুলে ধরছে। তেহরানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক রেজা নাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, অতীতের নানা হামলা, পারমাণবিক স্থাপনায় নাশকতা এবং একতরফা চুক্তি লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতার পর তেহরান আর বোমাবর্ষণের মুখে কোনো অন্যায্য সমঝোতায় বসবে না।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন