শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬,
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সংকট

ইরানে সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

ইরানে সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই ইরানে পুনরায় সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অচিরেই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তারা হয়তো আবারও ছোটখাটো অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। ইরানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উদ্দেশ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত গোপন সাংকেতিক নাম হলো অপারেশন এপিক ফিউরি। ট্রাম্প এর আগে উল্লেখ করেছিলেন যে ওয়াশিংটন চাইলে খুব দ্রুত এই সংঘাত শেষ করতে পারে। তবে যুদ্ধ দ্রুত থামানো উচিত নাকি ধীরে ধীরে এর পরিসমাপ্তি ঘটা সমীচীন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

চলতি সপ্তাহান্তেই একই ধরনের যুদ্ধসংকেত দিয়েছেন তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহেই হামলা হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যারাকের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং তিনি চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকলেও মাসের পর মাস ধরে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে রাখা হয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেহরানের ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ধারাবাহিক হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এই ধ্বংসাত্মক সংঘাত সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধান করা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজে পাল্টাপাল্টি আঘাত হানার এক বিপজ্জনক ধারায় জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলো অবরুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যার বিপরীতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের পর স্থলভাগে কোনো পক্ষ বড় কোনো হামলা না চালালেও যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি কর্মসূচির পরিচালক সুজান ম্যালনি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই এই যৌথ হামলা শুরু হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সৈন্য ও সমরসম্ভার বৃদ্ধি, আমেরিকান নাগরিকদের সতর্কবার্তা প্রদান এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকা বড় যুদ্ধের স্পষ্ট আলামত। ম্যালনির মতে, এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। একদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সাধারণ ইরানিরা ভুগছে, অন্যদিকে অবরোধ বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল নৌবহর সেখানে আটকা পড়েছে। ফলে কূটনীতি অথবা সামরিক আঘাতের মাধ্যমেই এর একটি পরিসমাপ্তি টানতে হবে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেসন ক্যাম্পবেল জানান, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মার্কিন রণতরী ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট এবং অতিরিক্ত একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে আমেরিকার বিমানবাহী রণতরীর সংখ্যা সাময়িকভাবে তিনে পৌঁছাবে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানে হামলার মহড়া হিসেবে আকাশে শক্তি প্রদর্শন করেছে এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েলে গিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সেরেছেন।

ক্যাম্পবেল আরও সতর্ক করেছেন যে, সংঘাতের সূচনালগ্নের তুলনায় বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে সামরিক বিকল্প অত্যন্ত সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো অতীতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে স্থল অভিযান পরিচালনার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই। এমনকি নতুন করে অবকাঠামোয় আঘাত হানলেও তা ইরানের মূল কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না, কারণ দেশটি ইতোমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার প্রস্তুতি প্রমাণ করেছে।