শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,
ইসলাম ও জীবন

হারাম উপার্জন পরিবার ও সমাজে যে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম

হারাম উপার্জন পরিবার ও সমাজে যে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে

হারাম উপার্জনের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল উপার্জনকারী ব্যক্তির পাপের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। অনৈতিক আয়ের সঙ্গে যখন মিথ্যাচার, প্রতারণা, অন্যের ন্যায্য অধিকার হরণ এবং পেশাগত দায়িত্বহীনতা যুক্ত হয়, তখন তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিবার, সন্তান, কর্মক্ষেত্র পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামে সম্পদের পরিমাণের চেয়ে সেটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং মানুষের কোনো অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, সেই নৈতিক প্রশ্নকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জনসমাজে প্রচলিত একটি কথা রয়েছে যে হারাম রিজিক ঘরে প্রবেশ করলে ঘরের আবহাওয়া বিষাক্ত হয়, প্রার্থনায় অনাগ্রহ দেখা দেয়, কোরআন থেকে মানুষ দূরে সরে যায়, দাম্পত্য কলহ বৃদ্ধি পায় এবং সন্তান অবাধ্য আচরণ করে।

এই বক্তব্যগুলো অত্যন্ত আবেগঘন এবং নৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোকে আক্ষরিক বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ হিসেবে সরাসরি বিবেচনা করা ঠিক নয়।

ইসলামে অবৈধ উপার্জনের আত্মিক ও নৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি থাকলেও কোনো পরিবারের টানাপোড়েন, মানসিক চাপ বা সন্তানের আচরণগত জটিলতার একমাত্র কারণ হারাম অর্থ—এমন একপেশে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিষয়টি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে হলে ধর্মীয় বিধান, মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব, পারিবারিক সম্পর্কের আধুনিক গবেষণা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপটকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

উপার্জনের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি নৈতিকতার।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন মানুষ যেন পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস না করে এবং অন্যের হক আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার না করে। একইভাবে একই সুরার ১৬৮ নম্বর আয়াতে বিশ্ববাসীকে হালাল ও পবিত্র বস্তু গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর ভিত্তিতে ঘুষ, প্রতারণা, আত্মসাৎ, ওজনে কম দেওয়া, ভুয়া হিসাব প্রস্তুত করা, শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ কামাইকে নিছক ব্যক্তিগত ত্রুটি ভাবা যায় না। এগুলো সামাজিক ন্যায়বিচারকে আঘাত করে।

একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে সুবিধা দেন, তবে তার নিজের পরিবারের সচ্ছলতা বাড়লেও একজন যোগ্য নাগরিক নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। একজন ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে লাভবান হলে ক্রেতার স্বাস্থ্য ও অর্থ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিয়োগকর্তা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধে দেরি করলে বা আটকে রাখলে শ্রমিকের সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যাহত হয়। অর্থাৎ অন্যায় উপার্জনের অপর পিঠে সবসময় অন্যের বঞ্চনা ও যন্ত্রণা জড়িত থাকে।

উপার্জনের বিশুদ্ধতার সঙ্গে ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতার সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

সহিহ মুসলিমের ১০১৫ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন যে আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্র বস্তুই কবুল করেন। হাদিসে দীর্ঘ পথযাত্রায় ক্লান্ত এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে, যে দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে; অথচ তার পানাহার, পোশাক ও জীবন ধারণের উৎস সম্পূর্ণ হারাম। এমন পরিস্থিতিতে তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে, সেই প্রশ্ন সেখানে তোলা হয়।

এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে উপার্জনের অনৈতিকতাকে আড়াল করা সম্ভব নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে এমন ব্যক্তির কোনো সৎকর্ম কখনোই গণ্য হবে না, কারণ চূড়ান্ত ফয়সালার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। প্রার্থনায় মনোযোগ হারানোর পেছনে পাপবোধের পাশাপাশি বিষণ্ণতা, ঘুমের সংকট, মানসিক অস্থিরতা কিংবা শারীরিক দুর্বলতাও থাকতে পারে। তাই কারো প্রার্থনায় ঘাটতি দেখলেই তার উপার্জন হারাম বলে চটজলদি মন্তব্য করা অনুচিত।

পরিবারের আবহাওয়া বদলে যাওয়া মূলত একটি অদৃশ্য নৈতিক পরিবর্তনের রূপক।

যে পরিবারে উপার্জনকারী প্রকাশ্য দুর্নীতি বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ এনে অহংকার প্রকাশ করেন, সেখানে সততা ও অন্যায়ের সীমানা ধীরে ধীরে মুছে যায়। বাবা যদি সন্তানকে সত্য কথা বলার নসিহত দিয়ে নিজে সামান্য লাভের জন্য অন্যায়ের আশ্রয় নেন, তবে সন্তান বাস্তব আচরণের সেই অসততাকেই অনুসরণ করতে শেখে।

মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার নৈতিক দায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বে দেখানো হয়েছে কীভাবে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অন্যায়কে যৌক্তিক প্রমাণ করতে শুরু করে। প্রথমে এটিকে ব্যতিক্রম ভাবা হয়, পরে পেশাগত কৌশল বলে আত্মতুষ্টি খোঁজা হয়। এভাবে পরিবারের ভেতর তৈরি হয় একটি দূষিত নৈতিক পরিবেশ।

দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অবৈধ আয়ের গোপনীয়তা বড় ক্ষত তৈরি করতে পারে।

আয় গোপন রাখা, দুর্নীতি প্রকাশের শঙ্কা এবং অন্যায়ের সমর্থন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক দাম্পত্যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করে। গবেষক কঙ্গার ও তার সহকর্মীদের পারিবারিক চাপ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে যে আর্থিক চাপ ও পরিবারের অভ্যন্তরীণ মানসিক সংকট অভিভাবকদের মধ্যে সংঘাত বাড়ায় এবং তা সন্তানদের ওপরও চাপ ফেলে। গবেষণাটি অসৎ উপার্জন নিয়ে সরাসরি না হলেও এটি স্পষ্ট করে যে অর্থ সংক্রান্ত মানসিক অস্থিরতা দাম্পত্য আস্থা পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে পারে।

সন্তানের আচরণ কোনো একক কারণে বিপথগামী হয় না।

বয়স, শারীরিক বিকাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, সঙ্গীদের প্রভাব এবং অভিভাবকের আচরণের মিথস্ক্রিয়ায় শিশুর চরিত্র গড়ে ওঠে। অভিভাবক যদি শক্তি প্রদর্শনের জন্য অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করেন, শিশু তা অনুকরণ করতে পারে। সুরা আত-তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে পরিবারকে বিপথগামিতা ও নৈতিক ধ্বংস থেকে রক্ষার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল খাদ্য জোগানোর দায়িত্ব নয়, বরং ন্যায়নিষ্ঠ মূল্যবোধ শেখানোর অঙ্গীকার।

হারাম উপার্জনের সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষত দৃশ্যমান হয় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে।

দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি পুরস্কৃত হলে যোগ্য ও সৎ কর্মীরা উৎসাহ হারান। সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ হলে রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক সুরক্ষা ভেঙে পড়ে। অন্যায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিলে ব্যক্তি নিজের দায় এড়িয়ে বলে থাকে যে সে কেবল নির্দেশ পালন করেছে। অথচ সুরা আল-মায়িদার ২ নম্বর আয়াতে পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহায়তা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

সমাজে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনকারী অনেককে বাহ্যিকভাবে বিশাল অট্টালিকা, গাড়ি ও সামাজিক প্রতিপত্তি নিয়ে প্রভাবশালী হতে দেখা যায়।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নৈতিক সাফল্য কখনোই এক বিষয় নয়। প্রচুর অর্থ থাকা মানেই সেখানে আত্মিক বরকত থাকা নয়। তবে হালাল পথে উপার্জনকারী প্রতিটি মানুষই সবসময় ধনী থাকবেন বা দুঃখে পড়বেন না—এমন ভাবাও অবাস্তব। সৎ মানুষও রোগশোক বা দারিদ্র্যের শিকার হতে পারেন। অন্যায় উপার্জনের মূল বিপদ হলো এটি ব্যক্তির আত্মাকে অনুভূতিহীন করে এবং অন্যের বঞ্চনার ওপর নিজের সুখ খোঁজে।

অতীতের অন্যায় বুঝতে পেরে ফিরে আসার পথ ইসলামে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

হারাম উপার্জন থেকে বাঁচার প্রথম শর্ত হলো অবিলম্বে সেই অন্যায় কাজ ত্যাগ করা এবং আন্তরিক অনুশোচনা নিয়ে তওবা করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো অন্যের হক ফিরিয়ে দেওয়া। যাদের পাওনা আটকে রাখা হয়েছে বা যাদের সম্পদ তছরুপ করা হয়েছে, তাদের অর্থ অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে। কোনো কারণে হকদারকে খুঁজে না পাওয়া গেলে কিংবা জটিল আইনি বা ধর্মীয় প্রশ্ন দেখা দিলে অভিজ্ঞ ইসলামি স্কলার ও আইনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। তওবা কেবল মনের ভেতর অপরাধবোধে ভোগা নয়, বরং সক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজের জীবনে সততা পুনর্নির্মাণ করা।