অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র রূপ নেওয়ায় রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সৌদি আরব। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ধাহরান সদর দপ্তর খালি করে কর্মীদের দূর থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির সাথে যুদ্ধাবস্থা শুরুর পর এই প্রথম এমন চরম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত ছয়জন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন।
তবে হঠাৎ ঠিক কোন প্রত্যক্ষ হুমকির কারণে এই জরুরি নির্দেশনা জারি করা হলো, তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো স্পষ্ট করা হয়নি। লোহিত সাগরের প্রবেশপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কৌশলগত নৌপথ বাব আল-মানদেভ প্রণালির দিকে হুথি যোদ্ধাদের নতুন করে অগ্রসর হওয়াকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে হুথিদের মুখোমুখি সংঘাত বাড়ায় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য এই নৌপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের বিভিন্ন তেল স্থাপনা ও বেসামরিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুথিদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ধারাবাহিকতায় আরামকো এই পদক্ষেপ নিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ধাহরানে আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে হুথিদের তীব্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সে সময় ভবনটির কয়েকটি তলায় ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিভিশনে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে দাবি করেছেন, তাঁদের যোদ্ধারা লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ইয়ানবু শহরের আরামকো স্থাপনা এবং রাজধানী রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় লক্ষ্য করে নতুন অভিযান চালিয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এসব লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, তারা রাজধানী রিয়াদ ও মদিনার আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একাধিক ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করেছে। হুথিদের হামলার জবাব দিতে সৌদি সামরিক বাহিনী ইয়েমেনের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে তাৎক্ষণিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সাথে হুথিদের ছোড়া বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ।
হুথিদের মুখপাত্র দাবি করেন, গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ইয়েমেনে সৌদি বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৫৬২ জন হতাহত হয়েছেন। ওই সময় থেকেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে হুতিরা, যার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও চূড়ান্ত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় ধাহরানের নিকটবর্তী দাম্মামে কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ছোড়া গোলায় এক সৌদি নাগরিক ও এক ভারতীয় নাগরিক নিহত হন। হামলায় গুরুতর আহত হন আরও আটজন ব্যক্তি।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, দাম্মাম বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে চলতি অক্টোবর মাসেই রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আভা বিমানবন্দরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথে ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে হুথিরা। গোষ্ঠীটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে চলার জন্য সতর্কবার্তাও দিয়েছে।
আরামকোর প্রধান দপ্তর খালি করার ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের প্রধান শেয়ারবাজারের সার্বিক সূচক দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে গেছে।
একই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি তিন দশমিক শূন্য ছয় মার্কিন ডলার বা দুই দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ১১১ দশমিক ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের একপর্যায়ে এর দাম ১১২ দশমিক ৫৫ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা গত ১৮ মে-এর পর সর্বোচ্চ রেকর্ড।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও বিস্তার ঘটলে পৃথিবীর প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক অঞ্চল থেকে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকেরা। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকায় সরবরাহ সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন