শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,
ইন্টারনেট স্বাধীনতা সূচক

ইন্টারনেট স্বাধীনতায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

ইন্টারনেট স্বাধীনতায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি

ইন্টারনেট স্বাধীনতায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মূল্যায়িত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফ্রিডম হাউসের প্রকাশিত ‍‍`ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬‍‍` শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থার গবেষণার ১৫তম এই সংস্করণে বাংলাদেশের স্কোর পাঁচ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১০০-এর মধ্যে ৫০-এ উন্নীত হয়েছে।

মূলত ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সময়কালের সার্বিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়।

তালিকায় থাকা ৩৮টি দেশের মধ্যে অগ্রগতিতে শীর্ষে থাকলেও সামগ্রিক শ্রেণিবিন্যাসে বাংলাদেশ এখনো ‍‍`আংশিক স্বাধীন‍‍` স্তরেই অবস্থান করছে। ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশটি এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, ২০১৬ সালের পর এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে পুরো এক বছরে কোনো ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা বন্ধের ঘটনা ঘটেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দমনমূলক নীতি ও বিধিনিষেধের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ডিজিটাল পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দমন-পীড়ন থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। তবে নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ টেকসই করতে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে দেশটি।

ফ্রিডম হাউস মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে মোট ২১টি সুনির্দিষ্ট সূচকের আলোকে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা পরিমাপ করে থাকে।

এগুলো হলো ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা, অনলাইন বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন।

স্কোর বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে সংযোগ বন্ধ না রাখার সিদ্ধান্ত। ফলে ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর আগের বছরের ২৫-এর মধ্যে ১২ থেকে বেড়ে ১৬ হয়েছে। অন্যদিকে অনলাইন বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য; যেখানে ৩৫ স্কোরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর ২০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১-এ।

তবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘনের দিকটি। এখানে প্রাপ্ত স্কোর আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে, যা ৪০-এর মধ্যে মাত্র ১৩।

সংস্থাটির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসারে, ৭০ থেকে ১০০ স্কোর পাওয়া দেশগুলোকে ‍‍`স্বাধীন‍‍`, ৪০ থেকে ৬৯ স্কোর পাওয়া দেশগুলোকে ‍‍`আংশিক স্বাধীন‍‍` এবং শূন্য থেকে ৩৯ স্কোর পাওয়া দেশগুলোকে ‍‍`স্বাধীন নয়‍‍` হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে ৫০ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ এখনো আংশিক স্বাধীন দেশ হিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত ‍‍`ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড‍‍` সূচকেও বাংলাদেশকে একই কাতারে রাখা হয়েছিল।

অতীতের ৫০ বছরের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ মাত্র দুই বছর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছিল, এক বছর ছিল স্বাধীনতাহীন তালিকায় এবং অবশিষ্ট পুরো সময় কাটিয়েছে আংশিক স্বাধীন হিসেবে।

সার্বিকভাবে বিশ্বে টানা ১৬ বছর ধরে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে।

চলতি বছর যে ৩৮টি দেশের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে ১৬টিতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং মাত্র আটটিতে উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে ইরানে ইন্টারনেটের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে। চীন ও মিয়ানমারে অনলাইন পরিবেশ এখনো বিশ্বের অন্যতম দমনমূলক পর্যায়ে রয়ে গেছে। বিপরীতে ইন্টারনেটের উন্মুক্ততায় শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়া।

ফ্রিডম হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমি ফ্লাই সতর্ক করে বলেছেন, কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজেদের দমনমূলক স্বার্থে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব ডিজিটাল হুমকি প্রতিহত করতে মানবাধিকারকর্মীদের আরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

গবেষণা প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক এবং ফ্রিডম হাউসের গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক কিয়ান ভেস্তেইনসন জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত ও অবাধ ইন্টারনেট ব্যবস্থার সুরক্ষা দিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।

উল্লেখ্য, গবেষণা কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে এবারের সংস্করণে ৩৪টি দেশের ওপর পর্যালোচনা কার্যক্রম স্থগিত রেখেছিল সংস্থাটি। আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বর্তমান ৩৮টি দেশকে বেছে নেওয়া হয়।