বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

বিশ্বজুড়ে হঠাৎওয়েবসাইট বন্ধের হিড়িক, কারণ কী

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

বিশ্বজুড়ে হঠাৎওয়েবসাইট বন্ধের হিড়িক, কারণ কী

ওয়েবসাইট বন্ধের হিড়িক পড়েছে বিশ্বজুড়ে, যার মূলে রয়েছে ইন্টারনেটের ভিত্তি প্রোগ্রামিং প্রযুক্তি পিএইচপিতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ছিদ্র।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা এই দীর্ঘস্থায়ী ফাঁকফোকর প্রকাশ্যে আনার পরই বিশ্বজুড়ে জরুরি সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পিএইচপি মূলত ২০০০-এর দশক থেকে বৈশ্বিক ওয়েব পরিকাঠামোর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বুধবার এই বিপজ্জনক আবিষ্কার প্রকাশ্যে আসার সাথে সাথেই বিভিন্ন দেশের সরকার ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তৎপর হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত জরুরি নিরাপত্তা সমাধান বা সফটওয়্যার প্যাচ ইনস্টল করা সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে হলেও সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলো ইন্টারনেট থেকে অফলাইনে সরিয়ে নিতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা উইজ-এর গবেষকরা এই ত্রুটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সবচেয়ে মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে ত্রুটি শনাক্তে ব্যবহৃত প্রযুক্তির উদ্ভাবক ওপেনএআই এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গভীর প্রভাব সৃষ্টিকারী নিরাপত্তা সংকট বলে বর্ণনা করেছে।

অধিকাংশ সাধারণ ব্যবহারকারী এই প্রযুক্তির নাম সরাসরি না শুনলেও কার্যত প্রতিদিন তারা এর মাধ্যমেই সেবা গ্রহণ করেন। এর পূর্ণ রূপ হলো পিএইচপি: হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর।

বিশ্বজুড়ে অনলাইন কেনাকাটার ই-কমার্স সাইট, মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া এবং ইন্টারনেটের বিশাল অংশের ওয়েবসাইটের ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ওয়ার্ডপ্রেস পরিচালিত হয় এই প্রযুক্তির ওপর ভর করে। গরিলা সাইবার সিকিউরিটির প্রধান নির্বাহী পল স্পেন ব্যাখ্যা করেন, ব্যবহারকারী যখন কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, তখন পেছনের যে কোড প্রয়োজনীয় ডেটা গুছিয়ে এনে পর্দায় পড়ার উপযোগী করে তোলে, সেটিই মূলত পিএইচপি। তবে সদ্য আবিষ্কৃত দুর্বলতার কারণে কোনো প্রমাণীকরণ বা পাসওয়ার্ড ছাড়াই দূরবর্তী আক্রমণকারীরা সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে এবং সংবেদনশীল গোপন উপাত্ত চুরি করতে সক্ষম ছিল। স্পেন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে হ্যাকাররা এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আঘাত হানতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে কোটি কোটি ওয়েবসাইটে। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিল স্লে সতর্ক করে বলেন, কোনো শক্তিশালী হ্যাকার চক্র বা শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র যদি একে ডিজিটাল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নেয়, তবে তার পরিণতি হবে বিপর্যয়কর।

সতর্কবার্তা জারির পরপরই বিশ্বজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অনলাইন বিশ্বকোষের পরিচালক উইকিমিডিয়া পূর্বসতর্কতা হিসেবে তাদের একাধিক প্রধান ডেটা সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছে। ফিনল্যান্ডের সরকার, এডিনবরা কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের বেশ কয়েকটি পেজ ও অনলাইন সার্ভিস সাময়িকভাবে অফলাইন করেছে। একই পদক্ষেপ নিয়েছে নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং স্কটল্যান্ডের বেশ কিছু স্থানীয় কাউন্সিল ও সরকারি স্বাস্থ্য বোর্ড। অস্ট্রেলিয়ার ইউএনএসডব্লিউ সিডনির সাইবার গবেষক সলিল কানহেরে জানান, দুর্বলতার প্রযুক্তিগত বিবরণ উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় আগামী দিনগুলোতে অননুমোদিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা বহুগুণ বাড়বে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সফটওয়্যার নির্মাতারা জরুরি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে এবং সব ব্যবহারকারীকে অবিলম্বে সংস্করণ আপডেট করার তাগিদ দিয়েছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা সব সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছে, দ্রুত মেরামত করা সম্ভব না হলে যেন সার্ভারগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাকডোর অনুপ্রবেশ হয়েছে কি না তা পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকেও সমপর্যায়ের নির্দেশনা এসেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক্স-এ দেওয়া বার্তায় নাগরিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পাবলিক ওয়েবসাইট যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনে সাময়িক সময়ের জন্য ওয়েবসাইট স্থগিত রাখা একটি অত্যন্ত কার্যকর পথ। মার্কিন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন জানিয়েছে, বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের কয়েক দিন আগেই তাদের পরিকাঠামো একাধিকবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।

নিরাপত্তা সংস্থা ক্যালিফ ও উইজ-এর গবেষকরা উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে লাখ লাখ লাইনের কোড স্ক্যান করে এই সাফল্য অর্জন করেন। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ রায়ান কো মন্তব্য করেন, নিরাপত্তার কথা না ভেবে কেবল কার্যকারিতার ওপর জোর দিয়ে সফটওয়্যার তৈরির পুরনো মানসিকতাই এই বিপদের মূল কারণ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদেরও পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং বিভ্রান্তিকর ফিশিং বার্তার ফাঁদে না পড়ার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।