শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬,
হজ নাকি বিয়ে অগ্রাধিকার

হজের সামর্থ্য ও জরুরি বিয়ে কোনটি আগে করবেন জেনে নিন শরিয়তের বিধান

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

হজের সামর্থ্য ও জরুরি বিয়ে কোনটি আগে করবেন জেনে নিন শরিয়তের বিধান

আর্থিক সচ্ছলতায় হজের সামর্থ্য অর্জন এবং একই সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে কোনটি আগে সম্পাদন করবেন—তা নিয়ে বহু অবিবাহিত মুসলিমের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে হজ সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ ইবাদত। অন্যদিকে মানবজীবনের স্বাভাবিক শারীরিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণ, আত্মিক পবিত্রতা রক্ষা এবং একটি সুস্থ পারিবারিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিয়ে নবীজির গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ না করলে পাপ বা অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কায় থাকেন, তবে তাঁর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বিয়ে ওয়াজিবের মর্যাদা লাভ করে।

এ কারণে অনেকের ক্ষেত্রেই আর্থিক টানাপোড়েন তৈরি হয় যে, জমানো অর্থ দিয়ে বিয়ে করলে হয়তো হজের সামর্থ্য আর অবশিষ্ট থাকবে না, আবার সেই অর্থে হজ আদায় করে ফেললে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিয়ের ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী এই অগ্রাধিকারের বিষয়টি মূলত ব্যক্তির বর্তমান আর্থিক অবস্থা, বিয়ের বাস্তব আবশ্যকতা, গুনাহে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং হজ ফরজ হওয়ার মৌলিক শর্তগুলো সম্পূর্ণরূপে পূরণ হয়েছে কি না—তার ওপর নির্ভর করে।

পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর হজ আবশ্যক করেছেন। সুরা আল-ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর এই ঘরের উদ্দেশ্যে হজ পালন করা অবশ্যকর্তব্য।

তবে শরিয়তের পরিভাষায় এই আর্থিক সামর্থ্যের অর্থ কেবল নগদ অর্থ হাতে থাকাই নয়। বরং হজের যাবতীয় ভ্রমণব্যয় বহনের পাশাপাশি নিজের অনুপস্থিতিকালীন সময়ে পরিবারের যেসব সদস্যের ভরণপোষণ নিজের দায়িত্বে রয়েছে, তাদের মৌলিক ব্যয়ভার নিশ্চিত রাখার বিষয়টিকেও আবশ্যক শর্ত করা হয়েছে।

কোনো ব্যক্তির অতিরিক্ত স্থাবর সম্পত্তির একটি অংশ বিক্রি করে যদি হজের ব্যয় সংকুলান সম্ভব হয় এবং অবশিষ্ট সহায়-সম্বল বা নিয়মিত আয়ের মাধ্যমে ফিরে এসে নিজের ও পরিবারের জীবনযাত্রা নির্বাহের উপায় থাকে, তবে শর্তসাপেক্ষে তাঁর ওপর হজ ফরজ হতে পারে। তবে নিজের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বা মূল সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়; বরং সম্পদের প্রকৃতি ও বাস্তব বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

হজ একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় যাত্রার চেয়েও আত্মশুদ্ধি, আন্তরিক তওবা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সোপান। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ পালন করল এবং কোনো ধরনের অশ্লীল বাক্য বা পাপাচার থেকে নিজেকে বিরত রাখল, সে পাপমুক্ত হয়ে এমন নিষ্পাপ অবস্থায় ঘরে ফিরবে, যেন তার মা তাকে আজই জন্ম দিয়েছেন। অপর হাদিসে নবীজি উল্লেখ করেছেন, কবুল হওয়া হজের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই হতে পারে না।

হজের এই সুবিশাল মর্যাদার কারণে সামর্থ্য থাকার পরও তা অযথা বিলম্বিত করা কোনোভাবেই সংগত নয়। তবে কারও ক্ষেত্রে বিয়ের প্রয়োজন যদি এমন তীব্র রূপ নেয় যে অবিলম্বে দাম্পত্যে না জড়ালে পাপে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, তখন বিধানের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হয়।

ইসলামের সাধারণ বিধানে বিয়ে একটি বরকতময় সুন্নত। কোনো ব্যক্তি যদি স্বাভাবিকভাবে পরিবার গঠনে আগ্রহী হন এবং চরিত্র স্খলনের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি না থাকে, তবে তাঁর ক্ষেত্রে এটি সুন্নত হিসেবেই গণ্য থাকে।

কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি তীব্র জৈবিক চাহিদা সংবরণ করতে অক্ষম হন এবং বিয়ের সংস্থান থাকা সত্ত্বেও তা না করলে হারামে লিপ্ত হওয়ার প্রত্যক্ষ ভয় থাকে, তবে তাঁর জন্য বিয়ে সম্পন্ন করা ওয়াজিব বা অবশ্যকরণীয় হয়ে পড়ে।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে সতর্ক করেছেন, হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিয়ের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রাখে, সে যেন অবিলম্বে বিয়ে করে। কেননা বিয়ে মানুষের দৃষ্টিকে অধিক সংযত রাখে এবং আত্মিক চরিত্রকে সর্বাত্মক হেফাজত করে।

ফলে শুধু টাকা জমেছে বলেই বাস্তব ঝুঁকি উপেক্ষা করে বিয়ের আবশ্যকতা এড়িয়ে চলা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি অযৌক্তিক অজুহাতে ফরজ হজের দায় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াও বৈধ নয়। ব্যক্তিকে অবশ্যই হজের ফরজ হওয়ার সময়কাল, আর্থিক সামর্থ্য ও নিজের চারিত্রিক নিরাপত্তার বাস্তব ঝুঁকি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শে চূড়ান্ত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।