অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
সমুদ্রের তলদেশের প্রধান ফাইবার অপটিক কেবল কোনো কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে মহাকাশের স্যাটেলাইট দিয়ে পুরো পৃথিবীর ডিজিটাল যোগাযোগ পুরোপুরি সচল রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে।
বিশেষ করে মার্কিন উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক বৈশ্বিক সংকটকালে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানামুখী বিশ্লেষণ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে স্টারলিংক সাময়িক যোগাযোগ টিকিয়ে রাখতে পারলেও সমুদ্রের তলদেশের সুবিশাল কেবল নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হয়ে ওঠার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বর্তমান স্যাটেলাইট ব্যবস্থার নেই।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিচালিত হয় সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিস্তৃত ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১৭ লাখ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জটিল নেটওয়ার্কে নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০০টির মতো দুর্ঘটনা ঘটে। একটিমাত্র আন্তর্জাতিক কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে লাখ লাখ গ্রাহক তীব্র ইন্টারনেট ধীরগতি বা সংযোগহীনতার মুখে পড়েন।
সাবমেরিন কেবল ও কৃত্রিম উপগ্রহের ডেটা পরিবাহী ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
সাধারণ কারিগরি হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রের তলদেশের একটি সাধারণ ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০ টেরাবিট বা ২০ হাজার গিগাবিট ডেটা অনায়াসে পরিবাহিত হতে পারে। বিপরীতে ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্যাটেলাইটের ডেটা পরিবহন সক্ষমতা সাধারণত মাত্র এক গিগাবিটের কাছাকাছি। অর্থাৎ তথ্য স্থানান্তরের গতি ও পরিমাণের দিক থেকে সমুদ্রের কেবল মহাকাশের একটি স্যাটেলাইটের তুলনায় প্রায় ২০ হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। ফলে মাত্র একটি প্রধান কেবলের সমান ডেটা ট্রাফিক সামাল দিতে একই সাথে আকাশে হাজার হাজার সক্রিয় স্যাটেলাইট লিংক চালু রাখার প্রয়োজন পড়বে, যা বর্তমান প্রযুক্তিতে বাস্তবসম্মত নয়।
সমুদ্রের তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত কেবল শনাক্ত করে তা মেরামত করতে অনেক সময় কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
এই দীর্ঘ মেরামতকালীন সংকটে স্টারলিংক কিংবা অন্যান্য কৃত্রিম উপগ্রহ মূলত একটি জরুরি নিরাপত্তা বলয় বা সুরক্ষা ছাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রযুক্তির বদৌলতে দুর্যোগের সময়ে মাঠপর্যায়ের হাসপাতাল, জরুরি সরকারি যোগাযোগ, সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং লেনদেন এবং টেক্সট বার্তা আদান-প্রদানের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো কোনোমতে টিকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কোনো দেশের সার্বিক জনগোষ্ঠীর একযোগে উচ্চমানের ভিডিও দেখা, বড় আকারের ডিজিটাল ফাইল স্থানান্তর কিংবা বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক সুবিশাল ডেটা চাহিদা মেটানো স্যাটেলাইটের পক্ষে একা সম্ভব নয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক সাইবার ও যোগাযোগ সুরক্ষাকে টেকসই করতে হলে কেবল মহাকাশের স্যাটেলাইটের ওপর একক নির্ভরতা তৈরি করা বিপজ্জনক। বরং সমুদ্রের তলদেশের কেবল, মাটির নিচের স্থল ফাইবার অপটিক অবকাঠামো এবং মহাকাশের উপগ্রহ—এই তিন স্বতন্ত্র প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যাকআপ গড়ে তুলে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকআউট এড়ানো সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন