অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০১:০২ পিএম
ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধের আশঙ্কা, সাইবার হামলা ও তীব্র জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকির মুখে নিজেদের নাগরিকদের আগাম খাদ্য ও জরুরি সামগ্রী মজুতের আনুষ্ঠানিক পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের একাধিক দেশ। যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং ফ্রান্স থেকে ভারত—প্রায় সব প্রান্তেই অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের প্রস্তুতি হিসেবে নাগরিকদের ঘরে অন্তত কয়েক দিনের খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে এমন প্রস্তুতিকে কেবল অতি সতর্ক ব্যক্তিদের বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটিকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। কারণ বড় ধরনের যুদ্ধ বা আঞ্চলিক বিপর্যয় দেখা দিলে বিদ্যুৎ গ্রিড, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং অবকাঠামো ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়তে পারে। ফলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগপর্যন্ত নাগরিকদের নিজেদের টিকে থাকার সক্ষমতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।
দেশভেদে এই প্রস্তুতির সময়সীমা ও নির্দেশনায় বৈচিত্র্য রয়েছে।
ফ্রান্সে দুর্যোগ শুরুর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফরাসি নাগরিকদের দ্রুত স্থানান্তরের উপযোগী একটি বিশেষ ‘জরুরি ব্যাগ’ প্রস্তুত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। যেখানে পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও ওষুধের পাশাপাশি নগদ টাকা, জরুরি নথিপত্র, বাড়ি ও গাড়ির বাড়তি চাবি এবং শিশুদের জন্য খেলনা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জার্মানিতে পশ্চিম জার্মানির ষাটের দশকের পুরনো নীতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে আগের ১৪ দিনের মজুতের লক্ষ্য কিছুটা কমিয়ে বর্তমানে ১০ দিনের খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির সরকার। জার্মানির নাগরিক সুরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, রান্না না করে খাওয়া যায় এমন শুকনো খাবার মজুত রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এ ছাড়া হাতে ঘুরিয়ে চালানো বা সৌরশক্তিচালিত রেডিও এবং পর্যাপ্ত মোমবাতি সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সাল থেকে প্রচলিত দুর্যোগ সুরক্ষা কর্মসূচিতে পরিবারগুলোর আলাদা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে বলা হচ্ছে। মার্কিন নির্দেশনায় মাথাপিছু দৈনিক এক গ্যালন বা প্রায় তিন দশমিক আট লিটার খাবার পানি মজুত রাখতে বলা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় কয়েক দিনের এবং হাওয়াই দ্বীপে অন্তত দুই সপ্তাহের রসদ মজুত রাখতে বলা হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে নর্ডিক অঞ্চলের দেশগুলো।
ফিনল্যান্ডে নাগরিকদের জন্য তিন দিনের খাদ্য মজুতের নির্দেশ দেওয়া হলেও সরকারের নিজস্ব খাদ্যভাণ্ডারে বিপুল শস্য সংরক্ষিত রয়েছে, যা দিয়ে জরুরি অবস্থায় পুরো নয় মাস দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা মেটানো সম্ভব।
সুইডেনে যেকোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের ন্যূনতম এক সপ্তাহের রসদ প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনে বিকল্প উপায়ে বেরি ফল চাষ ও পানির বোতল সংরক্ষণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
নরওয়েতেও ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি মাথায় রেখে এক সপ্তাহের সামগ্রী রাখতে বলা হয়েছে। ঘর গরম রাখতে বিকল্প হিটার ও পর্যাপ্ত গরম কাপড় মজুত করতে বলেছে ওসলো।
ডেনমার্কে তিন দিনের খাদ্য মজুতের একটি নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা বেঁধে দেওয়া হয়েছে নাগরিকদের জন্য। যার মধ্যে রয়েছে ৫০০ গ্রাম ক্রিস্পব্রেড, টমেটো সসে ৩০০ গ্রাম টিনজাত মাছ, ৩০০ গ্রাম করে ছোলা ও বিনস, ৫০০ গ্রাম পাস্তা, দেড় কেজি সবজি এবং ১০০ গ্রাম বাদাম।
অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত তিন থেকে সাত দিনের মজুতের কথা বলা হলেও কিছু অঞ্চলে দুই সপ্তাহের প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের খাদ্য চাহিদা আলাদাভাবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলায় রেসপিরেটর মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে দেশটির প্রশাসন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন