শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,
জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৫ মাসে সর্বোচ্চ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৫ মাসে সর্বোচ্চ

মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলার অতিক্রম করেছে।

একই সঙ্গে দ্রুত বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে জাতীয় আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছে, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চমূল্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশে ডিজেল আমদানির ব্যয়ের ওপর।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে সরকারকে আগের চেয়ে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে। এই দ্বিমুখী ধাক্কায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিশাল চাপ তৈরি হবে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকির চাহিদাও বিপজ্জনক হারে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম জানান, প্রায় সাড়ে সাত মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করে আসছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশের আমদানি ব্যয়কে অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। তিনি উল্লেখ করেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের দামের ওপর, যার ফলে সামগ্রিক জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রীয় খরচ ও ভর্তুকি বৃদ্ধির তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ ডলার অতিক্রম করেছে। ফলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা সামনের দিনগুলোতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তবে গরমের তীব্রতা কমে আসার কারণে বিদ্যুতের চাহিদায় কিছুটা স্বস্তি তৈরি হওয়াকে তিনি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় বা বৃদ্ধির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানবে ডিজেলনির্ভর সড়ক ও নৌ পরিবহন, কৃষির সেচ ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানায়। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে চাল, ডাল ও শাকসবজিসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। অপরদিকে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের খরচ বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হবে।

বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় বাধা তৈরি করতে পারে।

দেশীয় কূপগুলো থেকে গ্যাসের উৎপাদন দিয়ে জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় সরকারকে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দর চড়া থাকায় একই পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক রাখা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও ভারী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ টিকিয়ে রাখা প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাসের তীব্র ঘাটতি ও চড়া দাম একসঙ্গে কার্যকর থাকলে কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসন্ন শীত মৌসুমে তাপমাত্রা হ্রাসের কারণে গৃহস্থালি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বিদ্যুৎ চাহিদা কিছুটা কমলেও, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্য সেই সাময়িক স্বস্তিকে ম্লান করে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্থিরতা তৈরির পেছনে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা মূল ভূমিকা রেখেছে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর শায়বাহ তেলক্ষেত্রের নিকটবর্তী এলাকায় হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর অপরিশোধিত তেলের বাজার দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১২ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছায়।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগরে ইরানের ভাসমান তেলবাহী ট্যাংকারের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে এসেছে। ফলে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজের গতিবিধি বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা কেপলারের অপরিশোধিত তেলবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি স্পষ্ট করেছেন যে চীনে পাঠানোর জন্য খালাস করার মতো ইরানের হাতে আর কোনো তেলের মজুদ অবশিষ্ট নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সামরিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশকে দ্রুত বিকল্প সরবরাহকারী দেশ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে স্পট মার্কেটের ঝুঁকির বদলে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি নিশ্চিত করা এবং দেশের কৌশলগত জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

সরকার জাতীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নিলেও অতীতের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রাগুলোর অনেকগুলোই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আসন্ন সংকট কাটিয়ে উঠতে সমন্বিত উদ্যোগ, বাস্তবসম্মত জাতীয় মহাপরিকল্পনা এবং এর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।