অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
চলতি অর্থবছরের বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটানো ও অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে পাইপলাইনে থাকা পৌনে তিন বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ দ্রুত ছাড় করাতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। একই সাথে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নতুন করে আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়ার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। আগামী দুই মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট ঘোষণা করেছে নতুন সরকার।
রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা কাটাতে গত বছরের তুলনায় এক লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত অর্থ আদায় হচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশি ও বিদেশি দুই উৎস থেকেই ঋণ সংগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। শুধু বিশ্বব্যাংকের কাছেই বাংলাদেশের প্রত্যাশিত ঋণের সামগ্রিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য সব বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় সংস্থার সাথে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, সবার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অব্যাহত রয়েছে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া ও পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে দুই দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি খাতে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার এবং খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচিতে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশ দূষণ রোধ প্রকল্পে আরও এক বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাকি অর্থের সংস্থানে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করছে ইআরডি।
সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যেসব সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার কথা রয়েছে, সেগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি। তার মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি কার্যকর থাকুক বা না থাকুক, ব্যাংকিং খাতের দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি টেকসই নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।
পাইপলাইনে থাকা সহায়তার বাইরেও চলতি অর্থবছরেই অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিজেদের হিসাবে যুক্ত করতে চায় সরকার। গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলে ধরেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও ঋণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।
নতুন এই ঋণ প্রস্তাবনায় সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চার বিলিয়ন ডলার, প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্য সহজীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেড় বিলিয়ন ডলার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কারে তিন বিলিয়ন ডলার এবং অর্থনীতির টেকসই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও দেড় বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে আগামী দুই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে ইআরডি।
শর্তের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, যেসব কর্মসূচি নিয়ে এগোনো হচ্ছে সেখানে কঠিন শর্তের কথা বলা হলেও কোন শর্তটি আসলে জটিল, তা পরিষ্কার করা হয়নি। পুরোনো কর্মসূচি বহাল থাকলে সেখানে রাজস্ব খাতে ভ্যাটের হার একীভূত করা, কর অব্যাহতি কমানো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠনের মতো কাঠামোগত পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব পদক্ষেপ সরাসরি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একক শর্ত না হলেও তা দাতা সংস্থাকে আস্থায় রাখতে সহায়ক হতো।
ঋণ প্রাপ্তি সহজ করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সময়সীমা সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদনের সময়সীমা ১৮ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র আট মাসে সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ ছাড়ের পূর্বশর্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে দেওয়া সংস্কার প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সায় রয়েছে বলে দিনাজপুর টিভি ডট কম-কে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন