অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম
দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমে গেছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান সংকট, ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণের ঘাটতির সাথে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে দেশের বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তীব্র চাপ তৈরি করছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটির বাংলাদেশ উন্নয়ন সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।
তবে দেশে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি ঘটলে এবং সরকারের সংস্কার কর্মসূচি গতি পেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। পরিস্থিতি উত্তরণে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ এসেছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে উল্লেখ করেছেন, অর্থনীতির ধারাবাহিক অবনতি ঠেকিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে যেতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির স্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ এখনই নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংক তিনটি খাতকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। এগুলো হলো জ্বালানি সংকট লাঘব, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা। ব্যাংকিং খাতের ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান যাচাই সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি কার্যকারিতা বিবেচনায় নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় আইন ও বিধিবিধানের সংস্কার, অন্যায্য নিয়ন্ত্রক ছাড় প্রত্যাহার এবং খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ে একটি কার্যকর আইনি রূপরেখা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে সাধারণ আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জরুরি তারল্য সহায়তার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জ্বালানির বহুমুখী উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং সিস্টেম লস কমানোকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চয় এবং জ্বালানি দক্ষতায় বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুপারিশ এসেছে।
রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে করনীতি প্রণয়ন ও কর আদায় প্রশাসনের দায়িত্ব সম্পূর্ণ পৃথক করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। সমন্বিত করদাতা তথ্যভান্ডার ও কর শনাক্তকরণ নম্বরের সাহায্যে কর প্রশাসন ডিজিটাল করার পাশাপাশি লক্ষ্যহীন ও অযৌক্তিক কর অব্যাহতি পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। ভ্যাট কাঠামোকে সহজ করতে ভ্যাটের হার একীভূত করা, অব্যাহতি হ্রাস এবং প্রত্যক্ষ কর ও সম্পত্তি কর প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা সম্ভব হলে অতিরিক্ত ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে রাখা সম্ভব। আর এই ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে সরকারের নগদ আর্থিক সহায়তা ও খাদ্য সরবরাহ কর্মসূচিগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে কার্যকরভাবে দারিদ্র্যসীমার বাইরে বের করে আনা যাবে। এজন্য একটি ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির সাথে ফ্যামিলি কার্ড ও প্রস্তাবিত কৃষক কার্ডসহ সব সামাজিক ভর্তুকি কার্যক্রমকে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাপকভিত্তিক সাধারণ ভর্তুকির বদলে সংকটের সময় দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম এমন সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কল্যাণমূলক সহায়তা ব্যবস্থার দিকে দেশকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
দক্ষিণ এশিয়া প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট জানিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিকূলতার মধ্যেও এই অঞ্চল উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। তবে প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বিকশিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে সুফল পেতে হলে উপযুক্ত অবকাঠামো, মানবসম্পদের দক্ষতা এবং সহায়ক নিয়ন্ত্রক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ চাহিদার শক্তিতে চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নানা প্রতিকূলতায় ২০২৭ সালে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা সংকুচিত হয়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন