বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,

গঙ্গার পানি চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ চায় বাংলাদেশ নবায়নে আপত্তি

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১১:০৮ পিএম

গঙ্গার পানি চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ চায় বাংলাদেশ নবায়নে আপত্তি

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি হুবহু নবায়ন না করে নিজস্ব স্বার্থ সুরক্ষায় গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসার মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আয়োজিত নদী বিষয়ক জাতীয় সংলাপে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি স্পষ্ট করেছেন যে, বিদ্যমান চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষার বদলে বাংলাদেশ একটি নতুন রূপরেখা চায় যেখানে ন্যূনতম প্রাপ্য পানির সুরক্ষা নিশ্চিত থাকবে।

চুক্তিটির মূল বিতর্ক কেন্দ্রীভূত রয়েছে শুষ্ক মৌসুমে পানির নিশ্চয়তা না থাকাকে ঘিরে। ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ১০ দিন পর পর প্রবাহ পরিমাপ করে পানি বণ্টনের বিধান রয়েছে। নদীতে পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম থাকলে উভয় দেশ সমান ভাগ পাবে। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক আর বাকি অংশ পাবে বাংলাদেশ। তবে মূল সংকট তৈরি হয় যখন ফারাক্কা পয়েন্টে প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়। চুক্তির শর্তমতে এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের সরকার জরুরি আলোচনায় বসবে বলা হলেও, সমঝোতা না হলে বা ভারতীয় পক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করলে বাংলাদেশ কতটুকু পানি পাবে তার কোনো আইনি বা বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা রাখা হয়নি।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৭ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ফারাক্কায় প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ শতাংশের নিচে নেমে গেলেও বাংলাদেশ তার ভাগের পূর্ণ ৮০ শতাংশ পানি পাবে। কিন্তু পরবর্তী চুক্তিতে সেই ধারাটি বাদ পড়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার উজানে বিহার ও উত্তর প্রদেশে তিন শতাধিক বাঁধ ও সেচ অবকাঠামোর মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের ফলে ফারাক্কা পয়েন্টেই প্রবাহ নেমে আসে ২০ থেকে ৩০ হাজার কিউসেকে। প্রবাহ সংকটের অতীত নজির বেশ উদ্বেগজনক।

১৯৯৩ সালের মার্চে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গঙ্গার প্রবাহ নেমে এসেছিল মাত্র ২৬১ কিউসেকে। চুক্তি কার্যকরের পর ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ ফারাক্কা থেকে পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক পানি। যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য আবুল হোসেনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারত যখন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পায়, তখন বাংলাদেশের প্রবাহ অনেক সময় নেমে আসে ২০ হাজার কিউসেকের কাছাকাছি, যা দেশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে চরম সংকটে ফেলে।

১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ফারাক্কা ব্যারাজ পরীক্ষামূলকভাবে ৪১ দিনের জন্য চালু করা হয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে সেই পদক্ষেপের প্রভাব বহন করছে ভাটির বাংলাদেশ। শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়ায় বোরো ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প চরম পানি সংকটে পড়ছে। একই সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে সমুদ্রের নোনা পানি ঢুকে পড়ায় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে সুপেয় পানির সংকট তৈরি হয়েছে এবং কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে। গড়াই নদে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমিতে লবণাক্ততা বেড়ে বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে।

চলমান যৌথ নদী কমিশনের কারিগরি কমিটির আলোচনায় ভারত নতুন একটি প্রস্তাব সামনে এনেছে। তারা ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক গড় প্রবাহের হিসাব বাদ দিয়ে বিগত ৪০ বছরের গড় প্রবাহের ভিত্তিতে নতুন চুক্তি করার কথা বলছে। এ বিষয়ে নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত মত দিয়েছেন যে, বিগত চার দশক ধরে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের সময়কালকে ভিত্তি ধরে গড় নির্ধারণ করা পুরোপুরি অযৌক্তিক, কারণ ফারাক্কা বাঁধের সময়কাল দিয়ে নদীর সামগ্রিক প্রবাহ পরিমাপ করলে নদীর প্রাকৃতিক চরিত্রকেই অবমূল্যায়ন করা হয়।

আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসারে ভাটির দেশ হিসেবে পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করছে বাংলাদেশ। যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং নতুন নীতিমালায় দেশের অস্তিত্ব ও কোটি মানুষের জীবিকার প্রশ্নে ন্যূনতম পানির গ্যারান্টি ক্লজ নিশ্চিত করাই এখন মূল দাবি।