বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,
সংবিধান সংস্কার

সংবিধানে ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট দায়মুক্তি পাচ্ছেন যোদ্ধারা

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

সংবিধানে ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট দায়মুক্তি পাচ্ছেন যোদ্ধারা

সংবিধানে ফিরছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক গণভোটের ঐতিহাসিক বিধান। একই সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নিশ্চিতের পাশাপাশি এর বীর রাজনৈতিক ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের সুনির্দিষ্ট তফসিলে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দিতে যাচ্ছে সরকার। মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতেই এই নতুন সংবিধান সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে সব রাজনৈতিক দল ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষর করেছে, ঠিক সেভাবেই তা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। সংবিধানে এমন মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্বহাল করা হবে।

ষষ্ঠ বৈঠকে মোট ৬৩ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে শহীদদের পিতা-মাতা, ভাই এবং আহতদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত স্থানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। অনেকে এই ঘোষণাপত্র সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করার প্রস্তাবও দেন। জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলো যেভাবে একমত হয়েছিল, সেভাবেই সংবিধানে তা ধারণ করা হবে এবং তাদের সমস্ত প্রস্তাব ইতিমধ্যে লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

জুলাই যোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এর আগে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে যে আইন করা হয়েছিল তা এখনও বহাল রয়েছে। তবে বিচারিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি জটিলতা এড়াতে সংবিধানের তফসিলে সুনির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এর পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং শেখ হাসিনাসহ তার দোসরদের বিচারের গতি দ্রুত করার বিষয়ে প্রতিনিধিরা জোর দাবি জানিয়েছেন। সরকার ও আদালত বিচার কার্যক্রমে স্বাধীন হলেও তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং অভিযোগ বা চার্জ গঠনের মতো বিচারসহায়ক কাজগুলো দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সরকার আন্তরিক রয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডবিধির অধীনে অন্যান্য আদালতে চলমান মামলাগুলো নিবিড় তদারকির মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দীর্ঘ ছয় থেকে সাত মাসের আলোচনার ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঘোষণাপত্র প্রণীত হয়েছিল, যাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করে। সংবিধানের তফসিলে এটিকে এমনভাবে ধারণ করা হবে যাতে এটি পূর্ণ আইনি রূপ পায় এবং জুলাই যোদ্ধারা সাংবিধানিক দায়মুক্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সনদে যেভাবে স্বাক্ষর করেছে, সরকার ঠিক সেই অনুযায়ী কাজ করছে। নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া সনদ বাস্তবায়নের সুযোগ নেই, কারণ ঐক্যমত্য সেভাবেই তৈরি হয়েছিল। জাতীয় স্বার্থ এবং নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়গুলো সমন্বয় করে একটি সর্বজনগ্রাহ্য বিল সংসদে জমা দেওয়া হবে।

সংবিধানে বাধ্যতামূলক গণভোট ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অতীতে যে গণভোটের চর্চা ছিল তা ছিল আইনি গণভোট। কিন্তু সামনে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, সেগুলো পুরোপুরি সাংবিধানিক বাধ্যতামূলক গণভোট। সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ আট-এ উল্লিখিত মূলনীতি, অনুচ্ছেদ ৪৮, ৫৬ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হলে সংশোধনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগেই জনগণের রায়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করতে হবে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়াকে হাইকোর্ট ইতিমধ্যে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। আইনের গ্রহণ তত্ত্ব বা ডকট্রিন অব ইক্লিপসের আলোকেও বাতিলের ওই সিদ্ধান্ত দূর হয়ে আগের আইনি অবস্থা বহাল হয়েছে। সংসদে এটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হলে গণভোটের বিষয়টি আর কোনো প্রশ্নের মুখে থাকবে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামোর বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, ১৯৯৬ বা ২০০৬ সালের আগের কাঠামো হুবহু অনুকরণ করা হচ্ছে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার বর্তমানে সমাজের সব স্তরের নাগরিক, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, বিচারক, সাবেক বিচারপতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদদের মতামত গ্রহণ করছে। অতীতে বিতর্কিত হওয়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব অর্পণের শেষ সুযোগটি বাদ দেওয়ার পক্ষে সরকারের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে কেউ রাজপথে লংমার্চ বা কর্মসূচি পালন করলে সেটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে গণ্য হবে, তবে চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত সংসদের আলোচনার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।