অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
ইলিশ সংকটের মুখে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিবেশী ভারতের উদ্বৃত্ত মাছের সরবরাহ বাড়ছে। যেখানে দুর্গাপূজার প্রাক্কালে ভারতে মাছ পাঠানোর রেওয়াজ ছিল, সেখানে এখন উল্টো চিত্র তৈরি হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে এসেছে তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি মাছ। এই আমদানির বড় অংশ এসেছে ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা থেকে। বেনাপোল কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসে মাছ এসেছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি। পরবর্তী মাস আগস্টে এক লাফে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজিতে।
এই বিপুল পরিমাণ মাছের ঘোষিত আমদানি মূল্য প্রায় ছয় কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। স্থানীয় চাহিদার ঘাটতি থাকায় ভারতের পশ্চিম উপকূলের এই মাছ এখন বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে ইলিশ উৎপাদনের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন এক ধাক্কায় নেমে আসে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টনে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় সাত দশমিক ৮৩ শতাংশ কম।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উৎপাদন আরও কমে নেমেছে প্রায় পাঁচ লাখ টনে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পর থেকে দেশের মোট ইলিশ আহরণের বড় অংশ আসছে সমুদ্র ও মোহনা থেকে। অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে ইলিশের উপস্থিতি ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। নদীবক্ষে অতিরিক্ত পলি জমা, ডিম ছাড়ার নার্সারি এলাকার পরিবেশ ধ্বংস, নিষিদ্ধ জাটকা নিধন এবং পূর্ণবয়স্ক মাছ অতিরিক্ত আহরণের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ভারতের গুজরাটে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজ্যটিতে ইলিশ আহরণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৭ দশমিক ৭২ টনে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে শুধু ভারুচ জেলা থেকেই এসেছে সাত হাজার ৪১০ টন। এছাড়া নর্মদা নদীর অভ্যন্তরীণ অংশে ২০২৪-২৫ সালে যেখানে ধরা পড়েছিল মাত্র ১২৪ টন, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৬৪৬ টনে।
নর্মদা নদীর মোহনায় মিষ্টি ও লোনা পানির বিশেষ মিশ্রণকে সেখানকার উৎপাদনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গুজরাটের গবেষক আর বি ভালা এবং এ এম পারমার। গবেষকদের মতে, বর্ষাকালে নর্মদা দিয়ে নেমে আসা বিপুল মিষ্টি পানি এবং আরব সাগরের নোনা পানির সংমিশ্রণে সেখানে ইলিশের জন্য উপযুক্ত ব্র্যাকিশ ওয়াটার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গুজরাটের স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসে এই মাছের তেমন চাহিদা না থাকায় উদ্বৃত্ত মাছ রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের নদীতে ইলিশের বিচরণ কমে যাওয়ার পেছনে পরিবেশগত চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত হয়েছে। প্রথমত, শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ হ্রাস পাওয়া। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাওয়া পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। দ্বিতীয়ত, নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় চলাচলের পথ পরিবর্তন। তৃতীয়ত, শিল্পবর্জ্য ও দূষণে পানির গুণমান নষ্ট হওয়া এবং চতুর্থত, উপকূলের লবণাক্ততার ভারসাম্যহীনতা। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের চলাচলের গতিপথ সমুদ্রমুখী হয়ে পড়ছে।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর গঙ্গার উজানে ইলিশের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল বলে ভারতের কেন্দ্রীয় মৎস্য গবেষণা সংস্থার নথিতেও উল্লেখ রয়েছে। গবেষকদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, টেকসই সংরক্ষণ নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগর অববাহিকায় ইলিশ আহরণ বর্তমানের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। সংকট মোকাবিলায় নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও দূষণমুক্ত প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন